মৃত্যুর পরও কি নিরাপদ নয় নারীর মরদেহ? রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নারীর মরদেহের সঙ্গে যৌনাচারের অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায় ফরেনসিক পরীক্ষা ও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ে মরদেহে পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঘটনা মর্গের নিরাপত্তা, মরদেহের মর্যাদা রক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) ইউটিউব চ্যানেল ‘আলাপ এক্সপ্লেইন্স’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করা এক নারীর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়। ময়নাতদন্তে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ থাকলেও পরবর্তী ফরেনসিক পরীক্ষা ও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ে মরদেহে পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরেও একই ধরনের আরেকটি ঘটনার কথা উঠে এসেছে। ওই ঘটনায় এক নারীর মরদেহের নমুনা পরীক্ষায় একাধিক পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে মর্গের কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
আগেও ঘটেছে একই ধরনের ঘটনা
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৯ সালের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে ময়নাতদন্ত হওয়া কয়েকটি নারী ও কিশোরীর মরদেহের নমুনায় পুরুষের শুক্রাণু পাওয়া যায়। পরে সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় সেগুলোর সঙ্গে মর্গের সহকারী মুন্না ভগতের ডিএনএর মিল পাওয়া যায় বলে সে সময় তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
২০২০ সালের নভেম্বরে মুন্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি তৎকালীন মর্গকর্মী যতনলালের ভাগ্নে ছিলেন। এ ঘটনায় একাধিক মামলা হয়। ২০২৩ সালের জুনে আদালত দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে এক বছর সাত মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। তবে দণ্ডবিধির ২৯৭ ধারার অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। মামলার রায় ও আইনি ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, মৃতদেহের সঙ্গে যৌনাচারের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনের প্রয়োগ নিয়ে জটিলতা রয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মর্গের সহকারী নূরে আলম শান্ত ও তৎকালীন মর্গ ইনচার্জ যতনলালের নামও এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফল ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং অনিয়মের প্রতিবাদ করায় চিকিৎসকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
সিআইডির তদন্তের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২১ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গেও একই ধরনের অপরাধের অভিযোগ সামনে এসেছিল। এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের তথ্য প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নেক্রোফিলিয়া কী
মৃতদেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ বা মৃতদেহের সঙ্গে যৌনাচারকে সাধারণভাবে ‘নেক্রোফিলিয়া’ বলা হয়। এটি অস্বাভাবিক যৌন আচরণের একটি ধরন হিসেবে চিকিৎসা ও মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় আসে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আচরণের পেছনে কী মানসিক বা সামাজিক কারণ কাজ করেছে, তা মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞের পরীক্ষা প্রয়োজন; শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কারও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. মো. আজিজুল ইসলাম আলাপ এক্সপ্লেইন্সকে বলেছেন, এ ধরনের আচরণের পেছনে একাকীত্ব, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় ও হীনম্মন্যতার মতো বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর এই ব্যাখ্যা সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ; তদন্তে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য কি না, সেটি পৃথকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
আইনে কী আছে
বাংলাদেশে মৃতদেহের সঙ্গে যৌনাচারকে লক্ষ্য করে পৃথক ও সুস্পষ্ট অপরাধসংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান না থাকার বিষয়টি আইনজ্ঞদের আলোচনায় এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, এ ধরনের ঘটনায় কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগই নেই। দণ্ডবিধির ২৯৭ ধারায় মানবদেহের অবমাননার শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। অন্যদিকে ৩৭৭ ধারার প্রয়োগ নিয়ে মৃতদেহকে কেন্দ্র করে মামলায় আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০১৯ সালের ঘটনার বিচারেও এ জটিলতা দেখা গেছে।
আইনজ্ঞদের মতে, মৃতদেহের সঙ্গে যৌনাচারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে উপযুক্ত শাস্তির বিধান যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি হাসপাতালের মর্গে সার্বক্ষণিক নজরদারি, সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, প্রবেশ ও বের হওয়ার নথি সংরক্ষণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের পরিচয় যাচাই এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার করা দরকার।
ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা মরদেহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব। মৃত ব্যক্তি নিজের পক্ষে অভিযোগ জানাতে পারেন না; তাই ফরেনসিক পরীক্ষার স্বচ্ছতা, আলামত সংরক্ষণ এবং স্বাধীন তদন্তের গুরুত্ব আরও বেশি। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই মরদেহের মর্যাদা ও জনসাধারণের আস্থা রক্ষা করা সম্ভব।
সূত্র: আলাপ এক্সপ্লেইন্স; পূর্ববর্তী মামলার তথ্য: বিডিনিউজ