ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ১০৮ প্রদীপ জ্বেলে সন্ধিপূজা
দুর্গোৎসবের মহাষ্টমীতে কুমারী শিশুর মধ্যে দেবী দুর্গার প্রতীকী রূপ কল্পনা করে নারীশক্তির আরাধনা করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ঢাকার গোপীবাগে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে সোমবার সকালে আয়োজিত কুমারী পূজায় ছয় বছর বয়সী ইর্যা চক্রবর্তীকে দেবীর আসনে বসানো হয়। শাস্ত্রীয় নাম ‘উমা’। পূজা শেষে কুমারীর আশীর্বাদ—‘সবার মঙ্গল হোক’।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সৃষ্টির, স্থিতির ও লয়ের সঙ্গে যুক্ত মহাশক্তি কুমারীর মধ্যে বীজরূপে বিরাজ করেন। সেই বিশ্বাস থেকেই কুমারীকে দেবী দুর্গার প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। এ পূজার মধ্য দিয়ে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, মানবসেবা এবং সব মানুষের কল্যাণের বার্তা দেওয়া হয়।
রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাঁর স্ত্রী সারদা দেবীকে মাতৃজ্ঞানে পূজা করেছিলেন। সেই ভাবধারার ধারাবাহিকতায় উপমহাদেশের বিভিন্ন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে দুর্গোৎসবের অষ্টমীতে কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়।
ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজ বলেন, ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণের শিক্ষা অনুসারেই কুমারীকে আদ্যাশক্তি জ্ঞানে দুর্গাপূজার সময় আরাধনা করা হয়। বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপূজার সময় স্বামী বিবেকানন্দ নিজে কুমারী পূজা করেছিলেন। সে সময় নয়জন কুমারীকে পূজা করা হয়, তাঁদের একজনের পূজা করেন স্বামী বিবেকানন্দ নিজেই।
তিনি বলেন, স্বামী বিবেকানন্দ বিভিন্ন স্থানে কুমারী পূজা করেছেন। প্রচলিত ধারণায় ব্রাহ্মণ কন্যাকে কুমারী হিসেবে পূজার কথা বলা হলেও তিনি ব্রাহ্মণ, অব্রাহ্মণ এমনকি অহিন্দু কন্যাকেও আদ্যাশক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করেছিলেন।
পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজের ভাষ্য, কুমারী পূজা দুর্গোৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। বেলুড় মঠ, ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠসহ বিভিন্ন মঠ ও মিশনে দেবী দুর্গার জ্ঞানে কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়। সোমবার দেশের অন্যান্য রামকৃষ্ণ মঠেও এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সন্ধিপূজা
এদিকে সোমবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্বালন, পদ্মফুল ও বেলপাতা নিবেদনের মধ্য দিয়ে সন্ধিপূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি, কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ ও মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। এ সময় ভক্তরা অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভ শক্তির বিজয় এবং দেশ ও জাতির শান্তি ও মঙ্গল কামনা করেন।
ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, মহাষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও মহানবমীর শুরুর ২৪ মিনিট—মোট ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো এবং দেবীর চরণে ১০৮টি পদ্মফুল নিবেদনের রীতি রয়েছে।
মহানগর কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপের পুরোহিত বরুণ চক্রবর্তী বলেন, পঞ্জিকা অনুযায়ী সন্ধিক্ষণের সময় নির্ধারিত হয়। সেই নির্দিষ্ট লগ্নেই ৪৮ মিনিটের মধ্যে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়া এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করা হয়।
তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে শত্রুতা দূর হয়ে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক—এ কামনাও সন্ধিপূজার অন্যতম তাৎপর্য। দেবী কৈলাস থেকে মর্ত্যে শান্তির বার্তা নিয়ে আসেন—এমন বিশ্বাস থেকে ভক্তরা দেশ ও জাতির মঙ্গল এবং অশুভ শক্তির বিনাশ কামনা করেন।
মহানগর সর্বজন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, সন্ধিপূজার জন্য সময় মাত্র ৪৮ মিনিট হওয়ায় আগেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয়। পূজায় ব্যবহৃত পদ্মফুলের পাপড়ি বা অন্য কোনো অংশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। প্রদীপের শিখা ঠিক রাখার জন্য মণ্ডপে পাখা বন্ধ রাখা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়াসহ নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পদ্মফুল সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রস্তুতির কাজ চলে আগের দিন থেকেই।
নবমী উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহাপ্রসাদ বিতরণেরও আয়োজন করা হয়েছে। এ জন্য প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ ডেক প্রসাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান গোপাল চন্দ্র দেবনাথ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্দিরে প্রতিদিন হাজারো ভক্তের সমাগম হয়। বিশেষ তিথিতে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। এ কারণে স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
দুর্গোৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্য
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অসুর বধ করে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক। শরৎকালে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনকে ঘিরেই শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের দেবীপক্ষ মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এ সময় চণ্ডীপাঠ, মঙ্গলঘট স্থাপন ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবীকে আহ্বান জানানো হয়।
দুর্গাপূজার ষষ্ঠীতে বোধন, সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার পর দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মূল উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। এরপর কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের পর্ব শেষ হয়।
ধর্মীয় কাহিনি অনুসারে, ত্রেতাযুগে রাবণকে পরাজিত করে সীতা উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ভগবান রাম শরৎকালে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাসে দেবীর পূজার এই বিশেষ আয়োজন ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত। বসন্তকালে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজাকে বলা হয় বাসন্তী পূজা। তবে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে শারদীয় দুর্গোৎসবই সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি।
শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোড়ায় এবং গমন নৌকায়। প্রচলিত ব্যাখ্যায় ঘোড়ায় আগমনকে অস্থিতিশীলতা বা অশান্তির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, নৌকায় গমনকে শস্যবৃদ্ধি ও জলসম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত শুভ লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাসভিত্তিক ব্যাখ্যা; বাস্তব ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নয়।