৮৩৪ শহীদের নাম খোদাই, ভাস্কর্যে তুলে ধরা হয়েছে আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস; আ.লীগকে ফেরানোর চেষ্টা জুলাই শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা: তারেক রহমান
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হলো রাজধানীর ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সোমবার সকাল ১০টার দিকে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেন। পরে আধুনিকায়ন করা উদ্যান ঘুরে দেখেন এবং সেখানে স্থাপিত গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধিতা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে জুলাই শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে। বিরোধী দলকে গঠনমূলক সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সব বিষয়ে একমত না হলেও দেশের মানুষের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর সেখানে একটি গাছের চারা রোপণ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে না বলেই আমন্ত্রণ পেয়েও স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি। তাঁর ভাষ্য, বিরোধী দল আগের অবস্থানে ফিরে গেছে এবং বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করছে। তিনি বিরোধী দলকে সরকারের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করার আহ্বান জানান।
তারেক রহমান বলেন, “সব ব্যাপারে একমত না হতে পারলেও দেশের মানুষের স্বার্থে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেয়েছে। শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং জনগণ ভোটের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী দলকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।

স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের নাম, ভাস্কর্যে আন্দোলনের ইতিহাস
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে ওসমানী উদ্যানে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত স্থাপনাটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে শহীদদের নাম খোদাই করা হয়েছে। এর সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে রয়েছে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু একটি রিলিফ ভাস্কর্য। ভেতরে রয়েছে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু আরেকটি রিলিফ ভাস্কর্য। এসব ভাস্কর্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান।
তবে স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করা শহীদের সংখ্যা নিয়ে অনুষ্ঠানের তথ্য ও প্রকল্পের বিবরণে অমিল দেখা গেছে। প্রকল্পের বিবরণে ৮৩৪ জনের নাম থাকার কথা বলা হলেও প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ৮১৩ জন শহীদের নাম লিপিবদ্ধ থাকার কথা উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র ওসমানী উদ্যান
রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ওসমানী উদ্যানকে আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর উদ্যানটি খুলে দেওয়ায় নগরবাসীর হাঁটাচলা, শরীরচর্চা ও অবসর কাটানোর সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন গাছ লাগানো হয়েছে এবং তৈরি করা হয়েছে সবুজ দ্বীপ। উদ্যানের ভেতরে রয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, গাড়ি রাখার জায়গা ও জলাশয়ের ঘাট।
এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটিতে সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথও নির্মাণ করা হয়েছে। এসব অবকাঠামো উদ্যানটিকে নগরবাসীর অবসর ও শরীরচর্চার উপযোগী করে তুলবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়নের উদ্দেশ্য হলো একদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ, অন্যদিকে রাজধানীর নাগরিক পরিবেশের উন্নয়ন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন উপস্থিত ছিলেন।