বিভাগীয় নগরী রংপুরে প্লটের অভাবে শিল্পকারখানা স্থাপনে পিছিয়ে পড়ছেন নতুন উদ্যোক্তারা। এতে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ হচ্ছে না। পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলে বাড়ছে বেকারত্ব। হতাশ হতে হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তাকে। অথচ দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনে ২০০৪ সালেই জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
ওই সময় রংপুর নগরীর দমদমা এলাকায় রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে প্রায় ৫০ একর জমি অধিগ্রহণের অনুমোদন চেয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলেন উদ্যোক্তারা। সেই আবেদন আলোর মুখ না দেখায় পরে নতুন আরেকটি এলাকায় দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের জন্য জমি বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়। সেটিও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিসিক কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এখনো ঝুলে আছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, রংপুরে বিসিকের অধীনে ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু জমির অভাবে দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপনের আবেদন পড়ে থাকায় যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। এতে প্রতিনিয়ত কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রতিবছর হাজার হাজার স্বল্পশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত বেকারকে ঢাকাসহ বড় বড় শহরে পাড়ি জমাতে হচ্ছে।
বিসিক সূত্রে জানা যায়, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) রংপুরে কার্যক্রম শুরু করে ১৯৬৭ সালে। রংপুর নগরীর সিও বাজার এলাকায় ২০ দশমিক ৬৮ একর জমি অধিগ্রহণের পর তা ৮৩টি প্লটে ভাগ করে উদ্যোক্তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বর্তমানে রংপুর বিসিকে দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড (আরএফএল), জিএফএল, খান ফাউন্ড্রি লিমিটেড, চৌধুরী আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেড, বিসমিল্লাহ মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, নাইন জুট মিলস, হিমাদ্রি কোল্ড স্টোরেজ, রংপুর ফ্লাওয়ার মিলস, নর্দান টিম্বার ইন্ডাস্ট্রিজ, ফিনিক্স কেমিক্যাল অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ, মিল্ক ভিটাসহ ২৫টি শিল্প ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ প্লটই আরএফএলের দখলে। প্লটের আয়তন অনুযায়ী বিসিকে এ ক্যাটাগরির ১৩টি, বি ক্যাটাগরির ৩৯টি, সি ক্যাটাগরির ১৬টি, ডি ক্যাটাগরির ১৪টি এবং একটি বিশেষ প্লট রয়েছে।
শিল্পনগরী হওয়ায় বিসিকে কারখানা স্থাপনকারী উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ঋণ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সুবিধা পান। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে ২৫টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে ২২টি চালু রয়েছে।
২০১০ সালে রংপুর বিভাগ গঠনের পর এ অঞ্চলে উদ্যোক্তার সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়েনি বিসিকের প্লটের সংখ্যা। নতুন শিল্পকারখানা গড়ে তোলার আগ্রহ বাড়ায় ২০০২ সালে দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর ২০০৪ সালে ৫০ একর জমি নির্ধারণ করে জমি অধিগ্রহণের অনুমতি চেয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন জেলা প্রশাসক সদর উপজেলার হরিদেবপুর ও রামনাথপুর মৌজায় ১০০ একর জমির সম্ভাব্য মূল্য ও স্কেচ ম্যাপসহ দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠান। কিন্তু সেই আবেদনও ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য জায়গার সংকট কাটেনি।
নগরীর সিও বাজার এলাকায় প্রায় ২০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা বর্তমান বিসিক শিল্পনগরীতে উন্নয়নের তেমন ছোঁয়া লাগেনি। বেহাল সড়ক, ভাঙাচোরা ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিরাপত্তার অভাব ও অনুন্নত অবকাঠামো ব্যবসা পরিচালনায় অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে মোট ৮৩টি প্লট রয়েছে। প্লটগুলোর আয়তন সর্বনিম্ন ৩ হাজার ১৫০ বর্গফুট থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার বর্গফুট। মোট ২৫টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ২২টি চালু রয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট না থাকায় শিল্প ইউনিটগুলোকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে নিজ উদ্যোগে বর্জ্য অপসারণ করতে হচ্ছে। এতে কারখানা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে। বিসিক শিল্পনগরীর ভেতরের সড়কগুলো খানাখন্দে ভরা। বর্ষাকালে কিংবা সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুপানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতায় থাকা এ শিল্পনগরীর সংস্কার ও উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ উদ্যোক্তাদের।
বিসিক শিল্পনগরীতে থাকা কারখানার মালিকেরা জানান, গ্যাস-সংযোগ থাকলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হতো। অনেক সময় বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। নতুন দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী গড়ে উঠলে আরও অনেক উদ্যোক্তার কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। প্রতিদিনই নতুন নতুন শিল্পোদ্যোক্তারা বিসিক এলাকায় প্লটের খোঁজে আসছেন। কিন্তু তাঁদের প্লট দিতে পারছে না বিসিক কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পোদ্যোক্তা আবদুল মতিন বলেন, নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন করা হলে বেকারত্বের সমস্যা সমাধান সম্ভব। বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে বিশেষ অবদানের জন্য পুরস্কারপ্রাপ্ত নারী উদ্যোক্তা সামসী আরা জামান কলি দ্রুত দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তুলে নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে জমি বরাদ্দ দেওয়ার আহ্বান জানান। এতে পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলে নারীদের কর্মসংস্থানের পথ আরও সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।
উদ্যোক্তা আবদুর রহিম বলেন, শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য বিসিকে সহজ শর্তে ঋণ ও প্লট পাওয়া যায়। ভালো সড়ক যোগাযোগ এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বাড়বে। নতুন বিসিক শিল্পনগরী হলে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের লাইসেন্স ও অনুমতিপত্র পাওয়াও সহজ হবে। এ অঞ্চলে শিল্পায়নের বাধা দূর করতে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা জরুরি। তিনি রংপুর থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত বিস্তৃত গ্যাস পাইপলাইন থেকে নতুন শিল্পনগরীতে গ্যাস সরবরাহেরও দাবি জানান।
উদ্যোক্তা হারুন-অর-রশিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রংপুরে শিল্পায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁরা দ্রুত রংপুরে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী, ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিল্পায়নের বিকাশ চান। এতে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে বেকারত্ব কমবে এবং দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।
চেম্বার নেতাদের দাবি, বিসিকের দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপনের কার্যক্রম দ্রুত সচল করা জরুরি। প্রথম শিল্পনগরীর সব প্লট বরাদ্দ হয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির চাহিদা পূরণে সমস্যা হচ্ছে। নতুন শিল্পোদ্যোক্তারা অবিলম্বে শিল্প হাব ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।
রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি গোলাম জাকারিয়া পিন্টু বলেন, বর্তমান বিসিক শিল্পনগরী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। সেখানে নতুন উদ্যোক্তারা সুযোগ পাচ্ছেন না। এ কারণে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এমদাদ হোসেন বলেন, বিসিক শিল্পনগরীতে জায়গা না থাকায় রংপুরে যত্রতত্র ও কৃষিজমিতে শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। এতে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, যা খাদ্য উৎপাদনের জন্য হুমকি। তাই দ্রুত দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
রংপুর বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক এহসানুল হক বলেন, দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরীর জন্য জমি বরাদ্দের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ বিষয়ে জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাঁদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।