ঐতিহ্য হারিয়ে জৌলুসহীন কক্সবাজারের বার্মিজ মার্কেট: গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত শুঁটকির দোকান

এম জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ মার্কেটগুলো। স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি এবং তাদের হাতে তৈরি পণ্যে গুলো পর্যটকদের কাছে অনন্য করে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে অপরিকল্পিত নগরায়ন, ঐতিহ্য সংরক্ষণের অভাব এবং যত্রতত্র শুঁটকি দোকানের বিস্তারের ফলে এই ঐতিহ্য আজ মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।
​ঐতিহাসিকভাবে কক্সবাজারের বার্মিজ মার্কেটের মূল প্রাণ ছিল রাখাইন নারীরা। তাঁদের নিজ হাতে বোনা কিংবা মিয়ানমারের তাঁতের কাপড়, চাদর, লুঙ্গি এবং বিভিন্ন হস্তশিল্পের ব্যাপক কদর ছিল। মূলত বার্মিজ মার্কেটের মূল আকর্ষণ ছিল রাখাইন নারীদের ঐতিহ্যবাহী সাজগোছ এবং সুমিষ্ট কণ্ঠে আধো-ভাঙা সাধুভাষায় পণ্য বিক্রি করা।

​সিভিল সোসাইটির নেতা আনম হেলাল উদ্দিন বলেন, ​"বর্তমানে এই ব্যবসা থেকে রাখাইন নারীরা প্রায় পুরোপুরি সরে গেছেন এবং তাঁদের স্থান দখল করেছে বিভিন্ন বাইরের বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট। এর ফলে বার্মিজ মার্কেটগুলোতে এখন আর খাঁটি বার্মিজ পণ্যের দেখা মেলা ভার।" ​বর্তমানে এসব মার্কেটে চীন, থাইল্যান্ড ও ভারতের সাধারণ মানের প্রসাধনী, প্লাস্টিক পণ্য, জুতো এবং খেলনার পসরা সাজানো হয়েছে, যা দেশের অন্যান্য সাধারণ মার্কেটের মতোই রূপ নিয়েছে।

রাখাইন সোসাইটির নেতা মংলা মে বলেন, ​বার্মিজ মার্কেটগুলোর ভেতরে এবং আশেপাশের এলাকায় কোনো ধরনের নিয়ম বা পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠেছে অসংখ্য শুঁটকি মাছের দোকান। এর ফলে সেখানে সার্বক্ষণিক তীব্র দুর্গন্ধ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নান্দনিকতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ​নাজিরারটেক শুঁটকি মহাল ও বড় বাজারের শুঁটকি মার্কেটের গণ্ডি পেরিয়ে ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ মার্কেটের ভেতরে যত্রতত্র শুঁটকি দোকানপাট নির্মাণ এবং ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে বার্মিজ মার্কেটগুলোর দীর্ঘদিনের জৌলুস, আভিজাত্য ও নান্দনিক সৌন্দর্য চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

​কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক, আদিবাসী কল্যাণ ও উন্নয় সংস্থার সভসপতি, মং এ খিন রাখাইন বলেন, ​"পর্যটন নগরীর বার্মিজ মার্কেটের এই ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে বার্মিজ মার্কেটগুলোতে স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের প্রদর্শন ও বিক্রয় নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শুঁটকি মার্কেটগুলোকে বার্মিজ মার্কেট চত্বর থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে একটি নির্দিষ্ট ও দূরবর্তী স্থানে পরিকল্পিত জোনিংয়ের আওতায় নিতে হবে।"

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজারের বার্মিজ মার্কেট কেবল কিছু পণ্যের পসরা সাজানোর দোকান নয়; এটি রাখাইন ও বার্মিজ নারীদের অদম্য উদ্যম, শৈল্পিক রুচি এবং অর্থনৈতিক সংগ্রামের এক অনন্য দলিল। শত প্রতিকূলতার মাঝেও ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখে নারী ক্ষমতায়নের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তাঁরা স্থাপন করেছেন, তা কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা পেলে রাখাইন নারী উদ্যোক্তারা তাঁদের ব্যবসাকে আবারও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন।

 

শু/আজা

এলাকার খবর

সম্পর্কিত