রাখাইনে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে প্রত্যাবাসনের কথা বলেছে জান্তা সরকার। কিন্তু অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে অনিশ্চয়তা কাটেনি
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে মিয়ানমারে ফেরানোর বিষয়ে আবারও আশ্বাস দিয়েছে দেশটির সামরিক জান্তা। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো তালিকা যাচাই করে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। রাখাইন পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছে তারা।
প্রশ্ন হলো, এই প্রত্যাবাসন আদৌ কবে এবং কীভাবে সম্ভব হবে? কারণ রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পরও প্রত্যাবাসনের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলো রয়ে গেছে—রাখাইনের নিরাপত্তা, মিয়ানমারের নাগরিকত্বের প্রশ্ন, রোহিঙ্গাদের অধিকার এবং ওই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ।
যাচাই করা ৪ লাখ ২৬ হাজারের তথ্য
মিয়ানমারের দাবি, বাংলাদেশ তাদের কাছে মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য পাঠিয়েছে। এর মধ্যে তারা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে আরও ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে জান্তা সরকার। পাশাপাশি ৪ হাজার ২৪১ জনকে তারা কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছে। অর্থাৎ মিয়ানমারের দেওয়া হিসাবের মধ্যেই এখনো বড় একটি অংশের পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এখানেই প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা নিয়ে প্রথম বড় প্রশ্নটি তৈরি হচ্ছে।
২০১৭-এর পর নয় বছর
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ওই অভিযানে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আসছে। মিয়ানমার অবশ্য বরাবরই এই ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে আসছে। জান্তা সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়েছিল।
এই দুই ভিন্ন বয়ানের মাঝেই আটকে আছে প্রত্যাবাসনের রাজনীতি। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি মানবিক সংকট নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনারও বড় চাপ। আর রোহিঙ্গাদের জন্য প্রশ্নটি আরও মৌলিক—ফিরে গেলে তারা কোথায় থাকবেন, কী অধিকার পাবেন এবং তাদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে?
শুধু সীমান্ত পার করলেই প্রত্যাবাসন নয়
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরানোর আলোচনা বহু বছর ধরেই চলছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের জন্য একটি চুক্তিও করেছিল। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। কারণ প্রত্যাবাসন মানে শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া নয়। নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজন— নিরাপত্তার নিশ্চয়তা; বসতভিটা ও সম্পত্তির অধিকার; নাগরিকত্বের স্বীকৃতি; চলাচল ও কাজের অধিকার; শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ; এবং ভবিষ্যতে আবারও নিপীড়নের শিকার না হওয়ার নিশ্চয়তা। এই জায়গাগুলোতেই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। বরং তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ থেকে গিয়ে বসতি স্থাপন করা জনগোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করে। ফলে পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত।
রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
নতুন করে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা তৈরির পথে সবচেয়ে বড় বাস্তব বাধা সম্ভবত রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি। ২০২৩ সাল থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র লড়াই চলছে। এর ফলে অঞ্চলটির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ সামরিক জান্তার হাতের বাইরে চলে গেছে। এখানেই মিয়ানমারের নতুন প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার বড় সংঘাত দেখা যায়। জান্তা বলছে, ‘রাখাইন স্থিতিশীল হলে’ রোহিঙ্গাদের ফেরানো হবে। কিন্তু সেই স্থিতিশীলতা কবে আসবে, কে রাখাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে আরাকান আর্মি যদি রাখাইনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, তাহলে শুধু নেপিদোর সঙ্গে সমঝোতা করেই প্রত্যাবাসন কার্যকর করা কতটা সম্ভব হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের কী হবে?
সংকটটি আরও জটিল হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। ২০১৭ সালের পর প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা চললেও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে রাখাইনে সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাতের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। ফলে নয় বছর আগের সংকট এখন আর শুধু ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
নতুন করে আসা মানুষদের প্রত্যাবাসনের তালিকায় কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তাদের পরিচয় কীভাবে যাচাই হবে এবং মিয়ানমার তাদের গ্রহণ করবে কি না—এসব প্রশ্নও সামনে থাকবে।
মিয়ানমারের সংখ্যার সঙ্গে বাংলাদেশের হিসাবের পার্থক্য
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোহিঙ্গার সংখ্যা নিয়েও দুই দেশের বক্তব্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে বলে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন হিসাবে উঠে এসেছে। কিন্তু মিয়ানমার বলছে, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর বাংলাদেশে গেছে ৫ লাখ ৪০ হাজার মানুষ এবং উত্তর রাখাইনে আরও ২ লাখ রয়ে গেছে। অর্থাৎ সংকটের আকার ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এই অবস্থায় প্রত্যাবাসনের তালিকা তৈরি ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়াই হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘ আলোচনার বিষয়।

আশ্বাস কি এবার বাস্তব হবে?
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সর্বশেষ ঘোষণা তাই একদিকে আশাব্যঞ্জক, অন্যদিকে বাস্তবায়ন নিয়ে বড় প্রশ্নও তৈরি করছে। বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান। কিন্তু দ্রুত প্রত্যাবাসনের চাপে এমন কোনো প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না, যেখানে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা আবারও নিরাপত্তাহীনতা ও অধিকারহীনতার মধ্যে পড়েন। কারণ ২০১৭ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন টেকসই হয় না।
আর রাখাইনের বর্তমান বাস্তবতায় মিয়ানমারের সামরিক জান্তা কতটা কার্যকরভাবে সেই নিরাপত্তা দিতে পারবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তাই তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরানোর মিয়ানমারের ঘোষণা আপাতত একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে বাস্তবে কতজন রোহিঙ্গা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরতে পারবেন, তা নির্ভর করবে রাখাইনের যুদ্ধ, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার ওপর।
নয় বছর ধরে বাংলাদেশে অপেক্ষা করা রোহিঙ্গাদের কাছে এখন আর শুধু ‘ফেরার’ প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; তারা চায় নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা।