প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ ভারতীয় হাই কমিশনার ত্রিবেদীর

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সোমবার প্রথমবারের মত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ছবি: পিএমও ছবি:
ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সোমবার প্রথমবারের মত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ছবি: পিএমও ছবি:

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মেরামতের সন্ধিক্ষণে ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়া এই কূটনীতিক সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা

ভারতের হাই কমিশনার হিসেবে ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাস পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন দীনেশ ত্রিবেদী। দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে নতুন করে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করার আলোচনার মধ্যেই এ সাক্ষাৎ হলো।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি। তিনি বলেন, এটি ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎ। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।

গত ১২ জুন ভারতের হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশে আসেন দীনেশ ত্রিবেদী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কমিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার সময়েই তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।

ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা ত্রিবেদীকে দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে কূটনৈতিক দায়িত্বে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে নয়াদিল্লি। গত ২৫ জুন তিনি বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় দায়িত্ব নেন।

পরিচয়পত্র পেশের পরপরই ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভ্যাক) পরিদর্শন করেন তিনি। সেখান থেকে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকা পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা দেন নতুন হাই কমিশনার।

এরপর গত ২৯ জুলাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন ত্রিবেদী। সেসব আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টনসহ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।

সেদিন তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে দুই দেশের জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ত্রিবেদী বলেন, **“এমন কোনো সমস্যা নাই, যেটা পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে সমাধান করা যাবে না।”**

সম্পর্ক মেরামতে নতুন বার্তা

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষ থেকে দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে ঢাকায় হাই কমিশনার হিসেবে পাঠানোর বিষয়টিকে কূটনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নিয়োগ দেওয়ার যে প্রচলন রয়েছে, সেখান থেকে কিছুটা ভিন্ন পথে গিয়ে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী রাজনীতিককে ঢাকায় পাঠানো ভারতের কূটনৈতিক পদ্ধতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

ত্রিবেদীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক নৈকট্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরের সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি বাংলা ভাষা জানেন এবং দুই বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তার ধারণা রয়েছে। তিনি সেতারবাদক হিসেবেও পরিচিত।

কে এই দীনেশ ত্রিবেদী?

দীনেশ ত্রিবেদী পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের রাজনীতিক। গুজরাটি পরিবারে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক হিমাচল প্রদেশের একটি বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক ডিগ্রি নেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেন।

আশির দশকে কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পরে ১৯৯০ সালে জনতা দলে যোগ দেন। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভায় জনতা দলের সদস্য ছিলেন।

১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে দীনেশ ত্রিবেদী দলটিতে যোগ দেন। তিনি ছিলেন দলটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক।

২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সেই দায়িত্ব পান দীনেশ ত্রিবেদী। তবে পরে তাকে রেলমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হন তিনি। তবে বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে পরাজিত হন। পরে তৃণমূল তাকে আবার রাজ্যসভায় পাঠায়।

এরপর দলের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। একই বছরের ৬ মার্চ বিজেপিতে যোগ দেন।

ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়?

দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের পর ভিসা, পানিবণ্টন এবং দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন একটি ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে এই সাক্ষাতে ঠিক কোন কোন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে দুই পক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া আস্থার সংকটও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সোমবারের বৈঠক তাই কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা থাকছে। আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক কোন পথে এগোয়, বিশেষ করে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি হয় কি না, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে এই নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের সাফল্য।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত