‘হামমুক্ত’ জাপানে ফের হামের প্রকোপ, নেপথ্যে কী

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

হাম সংক্রমণে ধুঁকছে বাংলাদেশ। দেশে চলতি বছরে এই রোগে প্রাণহানি সাড়ে তিনশ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশের মতোই হামের প্রকোপে ধুঁকছে এশিয়ার আরও এক দেশ। প্রায় এক দশক ধরে ‘হামমুক্ত’ জাপানে পুনরায় এই ভাইরাসের থাবা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

এপ্রিলের শেষ নাগাদ দেশটিতে ৪৩৬ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন। এই সংখ্যা ২০১৯ সালের একই সময়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। যেখানে ২০১৯ সালে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা গিয়েছিল। হামের এই বিস্তারকে এখন আর কেবল একটি সাধারণ প্রাদুর্ভাব নয়, বরং জাপানের হার্ড ইমিউনিটির বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাপান ইনস্টিটিউট ফর হেলথ সিকিউরিটি জানিয়েছে, গত ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে শনাক্তের সংখ্যা ছিল ৬৮। সে হিসাবে চলতি বছর এপ্রিলের ২৬ তারিখ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪৩৬-এ দাঁড়িয়েছে। ইনস্টিটিউটটি অনুমান করছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭০ শতাংশ সংক্রমিত হয়েছেন দেশের বাইরে থেকে আসা ভাইরাসে। অথচ ২০১৫ সালেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জাপানে ‘হাম নির্মূল’ হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছিল।

জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া সেসব ব্যক্তিকে টিকা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়, যারা এমন শিশুদের আশপাশে থাকেন যাদের এখনো টিকা দেয়া হয়নি। সেই সঙ্গে বিমানবন্দরের কর্মী এবং অন্যদের যারা ভ্রমণকারীদের বা পর্যটকদের সংস্পর্শে যান, তাদেরও হামের টিকা দিতে বলা হয়।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এটি ইনফ্লুয়েঞ্জার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি সহজে ছড়ায়। এটি বাতাসের মাধ্যমে এতটা ছড়িয়ে পড়তে পারে যে কেবল একই ঘরে থাকলে সংক্রমণ হতে পারে।

সংক্রমণের পরে, প্রায় ১০ দিনের মধ্যে জ্বর, কাশি এবং নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো লক্ষণগুলো দেখা দেয়, যার পরে সারা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। বলা হয়, হামে প্রতি ১ হাজার রোগীর মধ্যে একজনের মৃত্যু হতে পারে।

জাপানের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, হামের ভাইরাস বিদেশ থেকে ফিরে আসা ব্যক্তি বা জাপানে ভ্রমণকারী বিদেশি পর্যটকদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

হামের সংক্রমণ প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হলো টিকা। জাপানে বর্তমান রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতে দুটি ডোজ থাকে, একটি এক বছর বয়সে এবং অন্যটি এলিমেন্টারি স্কুলে প্রবেশের আগের বছরে। উভয় ডোজই বিনামূল্যে দেয়া হয়। কিন্তু দুই ডোজের কর্মসূচি কেবল ২০০৬ সালের এপ্রিলে শুরু হয়েছিল। এর আগে নাগরিকরা সাধারণত কেবল একটি ডোজ পেত অথবা অনেকে সেটিও পেত না। তার ওপর করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে টিকাদানের হার কমে গেছে।

হামের টিকার একটি ডোজ ৯৩ শতাংশ থেকে ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দেয় বলে মনে করা হয়। দুই ডোজ নিলে এই সুরক্ষার হার ৯৭-৯৯ শতাংশ পর্যন্ত হয়। সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার থেকে সমাজকে সামগ্রিকভাবে রক্ষা করতে টিকাদানের হার অন্তত ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই পরামর্শই দিয়ে থাকে।

কিন্তু জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে দ্বিতীয় ডোজ হামের টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশ অতিক্রম করেনি এবং বছর বছর কমেছে। ২০২৪ অর্থবছরে টিকাদানের হার ৯১ শতাংশে নেমে এসেছে।

এমনকি দুটি ডোজের পরও টিকাদানের দীর্ঘ সময় পর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তার মানে হলো রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গেলে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সংক্রমণের প্রতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।

জাপানে সাধারণত এমআর (হাম ও রুবেল) ভ্যাকসিন বিতরণ করা হয়। তার মানে একটি টিকা দুটি সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ করতে পারে। কিন্তু মানুষ যখন রুটিন টিকাদানের নির্ধারিত সময় পার করে ফেলে, তখন তাদের প্রতি ডোজের জন্য প্রায় ১০ হাজার ইয়েন (প্রায় ৬৪ ডলার) খরচ করতে হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আজকাল সমাজের যে অবস্থা, তাতে টিকাদানের জন্য ১০ হাজার ইয়েন খরচ করাটা সহজ নয়। এই খরচের কারণেই অনেকে হাম নিয়ে শঙ্কিত থাকলেও টিকা নিতে দ্বিধা করেন।

সূত্র: এনএইচকে

এলাকার খবর

সম্পর্কিত