জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণ শুরুর সময় বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদল কক্ষ ত্যাগ করে। এ তালিকায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলও ছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এ ঘটনা ঘটে।
নেতানিয়াহু ভাষণ দিতে পোডিয়ামের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ডজন প্রতিনিধিদল সাধারণ পরিষদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। কেউ পুরো প্রতিনিধিদল নিয়ে বেরিয়ে যায়, আবার কোনো কোনো দেশ একজন প্রতিনিধি বা জুনিয়র কূটনীতিককে কক্ষে রেখে যায়। এর ফলে সাধারণ পরিষদ কক্ষের বেশ কয়েকটি অংশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন ফাঁকা দেখা যায়।
আনাদোলুর ফুটেজভিত্তিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, প্রায় ৭০টি দেশের প্রতিনিধিদল হয় কক্ষ ছেড়ে যায়, নয়তো তাদের আসন ফাঁকা ছিল। ওই পর্যালোচনায় বাংলাদেশের পাশাপাশি তুরস্ক, ফিলিস্তিন, তিউনিসিয়া, সিরিয়া, আলজেরিয়া, ইয়েমেন, মিসর, ইরাক, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরান, কাতার, লেবানন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত, স্পেন, ব্রাজিল, পেরু, কিউবা, নাইজেরিয়া, ঘানা, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ওমান, নাইজার, মাদাগাস্কার, বতসোয়ানা, বাহামাস, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা এবং কাবো ভার্দের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোন কোন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াকআউট করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা প্রকাশিত হয়নি; কিছু ক্ষেত্রে খালি আসনের দৃশ্যের ভিত্তিতে প্রতিনিধিদলের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।
রয়টার্সের ভিডিও প্রতিবেদনেও নেতানিয়াহুর বক্তব্য শুরুর সময় ‘dozens of delegates’ কক্ষ ত্যাগ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ওয়াকআউটের মধ্যেই বক্তব্য চালিয়ে যান নেতানিয়াহু
প্রতিনিধিরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও বক্তব্য চালিয়ে যান নেতানিয়াহু। কক্ষে থাকা তার সমর্থকেরা তাকে করতালি ও স্লোগানের মাধ্যমে সমর্থন জানান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ওয়াকআউট করা প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তীব্র ভাষায় মন্তব্য করেন এবং তাদের ‘moral cowards’ বলে অভিহিত করেন।
প্রায় ৪০ মিনিটের বক্তব্যে নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল গণহত্যা করেনি। ইসরায়েল গণহত্যা প্রতিরোধ করেছে।’
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ইসরায়েল ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
মামদানিকেও আক্রমণ নেতানিয়াহুর
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিরও সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা মামদানি এর আগে নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং আইনগতভাবে সম্ভব হলে তাকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিলেন।
নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে মামদানির অবস্থানের সমালোচনা করেন এবং তার বিরুদ্ধে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। মামদানি পরে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের জবাব দেন।
মামদানি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা আড়াল করতে জাতিসংঘের মঞ্চ ব্যবহার করেছেন। তিনি নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রসঙ্গ তোলেন।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির পরোয়ানা
২০২৪ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেতানিয়াহু ও তৎকালীন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আদালত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের কথা জানিয়েছিল।
ইসরায়েল ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আইসিসির এখতিয়ার ও সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে। নেতানিয়াহু তার জাতিসংঘের ভাষণেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
সবাই ওয়াকআউট করেনি
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় সাধারণ পরিষদ কক্ষ পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায়নি। বেশ কিছু দেশের প্রতিনিধিদল কক্ষেই অবস্থান করে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, ইউক্রেন, চেকিয়া ও গ্রিসের প্রতিনিধিরা কক্ষে ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও নরওয়ের প্রতিনিধিরাও কক্ষে ছিলেন।
চীনের প্রতিনিধিদল থেকেও একজন কূটনীতিক কক্ষে ছিলেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের প্রতিনিধিরাও বক্তব্যের সময় উপস্থিত ছিলেন। ফলে ঘটনাটিকে জাতিসংঘে সর্বসম্মত বয়কট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি ছিল বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ বা ওয়াকআউটের একটি দৃশ্যমান প্রতিবাদ।
জাতিসংঘের বাইরে বিক্ষোভ
নেতানিয়াহুর ভাষণের আগে ও পরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের আশপাশে বিক্ষোভও হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক শ বিক্ষোভকারী জাতিসংঘের কাছে জড়ো হন। কেউ কেউ যান চলাচলে বাধা দেন এবং ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করে স্লোগান দেন। পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে।
বিভিন্ন ইহুদি, মুসলিম ও ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন পৃথক কর্মসূচি পালন করে। ‘জুয়িশ ভয়েস ফর পিস’সহ কয়েকটি সংগঠন নেতানিয়াহুর নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের আয়োজন করে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব কর্মসূচিতে অভিনেতা ও সংগীতশিল্পীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ অংশ নেন এবং কয়েকজনকে পুলিশ আটক করে।
নেতানিয়াহুর এবারের জাতিসংঘ ভাষণ এমন এক সময়ে হলো, যখন গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সামরিক উত্তেজনাও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আলোচনায় বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের কক্ষে একাধিক প্রতিনিধিদলের ওয়াকআউট এবং বাইরে বিক্ষোভ—দুই ঘটনাই নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মতপার্থক্যের দৃশ্যমান প্রকাশ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে কোন কোন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো প্রতিনিধিদল নিয়ে ওয়াকআউট করেছে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা না থাকায় দেশভিত্তিক তালিকাটি ফুটেজ ও সংবাদমাধ্যমের পর্যালোচনার ভিত্তিতে দেখা হচ্ছে।