রংপুরের গঙ্গাচড়ায় বিদ্যালয়ে আয়া পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে এক নারীর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিনবিনা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাজিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ছয় বছর আগে ওই নারীর মেয়েকে বিদ্যালয়ে আয়া পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আট লাখ টাকা দাবি করা হয়। এর মধ্যে ২০১৯ সালে তিন লাখ এবং ২০২২ সালে আরও দুই লাখ টাকা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চাকরি দেওয়া হয়নি। পরে ওই পদে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
চাকরির আশায় দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর টাকা ফেরত চাইলে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন সামছুনাহার বেগম। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে তিনি গঙ্গাচাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
সামছুনাহার বেগমের অভিযোগ, তাঁর বাড়ি বিদ্যালয়ের কাছেই। তাঁর মেয়ে মোছা. করিনা বেগমকে বিনবিনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়া পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রধান শিক্ষক আট লাখ টাকা দাবি করেন। চাকরি পাওয়ার আশায় তিনি বিভিন্ন সময়ে মোট পাঁচ লাখ টাকা দেন। সামছুনাহার বলেন, “চাকুরির জন্য আট লাখ টাকা দাবি করা হয়। প্রথমে তিন লাখ, পরে আরও দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। পাঁচ লাখ টাকা নেওয়ার পরও আমার মেয়েকে চাকুরি দেওয়া হয়নি। অন্য একজনকে চাকুরি দেওয়া হয়েছে। টাকা ফেরত চাইলে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে।”
অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের আয়া, নাইটগার্ড ও পিয়ন পদে স্থানীয়দের চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। স্থানীয়দের জন্য সাত থেকে আট লাখ টাকা এবং বাইরের লোকদের ক্ষেত্রে আরও বেশি টাকা প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, তাঁর বোনের কাছ থেকে প্রথমে দুই লাখ এবং পরে আরও তিন লাখ টাকা নেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার সময় লিখিত প্রমাণ বা কোনো রসিদ চাওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি। তবে প্রধান শিক্ষক লিখিত প্রমাণ থাকলে চাকরি হবে না বলে জানিয়েছিলেন বলে তাঁর দাবি। রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, “আমরা অসহায় মানুষ, তাই কোনো লিখিত কাগজ ছাড়াই হাতে হাতে টাকা দিয়েছি। পরে চাকরি না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।”
শফিকুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, প্রধান শিক্ষক চাকরি দেওয়ার কথা বলে পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছেন—এ বিষয়টি তিনি জানেন। তাঁর দাবি, টাকা নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও চাকরি দেওয়া হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি।
অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ আগস্ট বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সেখানে কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় সামছুনাহারকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক মো. নাজিমুল ইসলামের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিদ্যালয়ের এক কর্মচারী। বিদ্যালয়ের কেরানি আজিজুল বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে দেখেননি। তাঁর দাবি, প্রধান শিক্ষক শিক্ষা অফিসে কাজ থাকার কথা বলে বাসায় থাকেন। একবার তাঁর বাসায় গিয়ে প্রধান শিক্ষককে সেখানেই পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। হাজিরা খাতায় প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষরের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ওই কর্মচারী। তাঁর দাবি, খোকন নামে একজন শিক্ষকের মাধ্যমে হাজিরা খাতায় প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষর করেন। তবে বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক মাঝে মধ্যে বিদ্যালয়ে আসেন।
অভিযোগকারী পক্ষের সঙ্গে কথা বলা এরশাদ নামের এক ব্যক্তি বলেন, আয়া পদে চাকরি দেওয়ার জন্য আট লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে তিন লাখ এবং ২০২২ সালে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার পরও চাকরি হয়নি এবং পরে অন্য একজনকে আয়া পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে তারা জানতে পারেন। টাকা দেওয়ার সময় প্রমাণ চাওয়া হলেও তা দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক মো. নাজিমুল ইসলাম। তিনি বলেন, সামছুনাহার যে অভিযোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ ভুয়া। তাঁর সম্মানহানি করার উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রধান শিক্ষকের বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগের বিষয়ে গঙ্গাচাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, তিনি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যালয়ের পাশে বসবাসকারী দুজন ব্যক্তি প্রধান শিক্ষককে তাঁর সামনে আটক করেছিলেন। পরে তিনি প্রধান শিক্ষককে সাত দিনের মধ্যে বিষয়টি সমাধান করতে বলেছেন। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রধান শিক্ষক তিন বছর ধরে বিদ্যালয়ে আসেন না—এ অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বিদ্যালয়ে আসেন, তবে কম আসেন।
এ বিষয়ে গঙ্গাচাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগটি তাঁর কাছে এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।