একসময় বাংলাদেশের ফুটবলে দলবদল মানেই ছিল উৎসব। নতুন খেলোয়াড়দের বরণ করে নিতে ক্লাব প্রাঙ্গণে জড়ো হতেন সমর্থকেরা, ঢোল-বাদ্যের তালে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। সেই পুরোনো আবহ যেন আবারও ফিরিয়ে আনল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। বৃহস্পতিবার তারকায় ঠাসা নতুন দল নিয়ে বর্ণিল সাইন-অন ডে আয়োজন করেছে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাদা-কালো ক্লাবটি।
এদিন মোহামেডান ক্লাব প্রাঙ্গণ পরিণত হয় উৎসবের মঞ্চে। ঢোলের তালে ট্রাম্পেটের সুর, সমর্থকদের ‘মোহামেডান, মোহামেডান’ স্লোগান আর নতুন খেলোয়াড়দের ঘোড়ার গাড়িতে করে ক্লাবে নিয়ে আসার দৃশ্য ফিরিয়ে দেয় দেশের ফুটবলের সোনালি দিনের স্মৃতি। সাবেক ও বর্তমান ফুটবলারদের পাশাপাশি ক্লাবের কর্মকর্তারাও অংশ নেন আয়োজনে।
পরে ফুল দিয়ে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ভবনে। সেখানে ৩৩ খেলোয়াড়ের নিবন্ধনের কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়। যদিও ক্লাবটি এরই মধ্যে অনলাইনে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল।

এবারের দলবদলে শুরু থেকেই শক্তিশালী দল গড়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল মোহামেডানের নতুন পরিচালনা পর্ষদ। বসুন্ধরা কিংস ও আবাহনী ফিফার নিষেধাজ্ঞার কারণে দল গঠনে সমস্যায় পড়ায় মোহামেডানের সামনে সুযোগ তৈরি হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বসুন্ধরা কিংস থেকেই একসঙ্গে আটজন খেলোয়াড়কে দলে টেনেছে সাদা-কালোরা।
২০০৯-১০ মৌসুমের পর এবারই প্রথম জাতীয় দলের এত বেশি খেলোয়াড় নিয়ে দল সাজিয়েছে মোহামেডান। এমনকি ২০২৪-২৫ মৌসুমে লিগ শিরোপা জেতা দলেও জাতীয় দলের এত খেলোয়াড় ছিলেন না।
বর্তমান দলে রয়েছেন জাতীয় দলের দুই গোলরক্ষক আনিসুর রহমান জিকো ও সুজন হোসেন। তাঁদের সঙ্গে আছেন ফয়সাল আহমেদ ফাহিম, সোহেল রানা জুনিয়র, সাদ উদ্দিন, শাহরিয়ার ইমন, রহমত মিয়া, শাকিল আহাদ তপু, জাহিদ হাসান শান্ত, মজিবুর রহমান জনি ও রিমন হোসেন। গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন দলের বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কেও ধরে রেখেছে ক্লাবটি।
সবশেষে মোহামেডানে যোগ দিয়েছেন জিকো। বৃহস্পতিবার দুপুরে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে প্রথমবারের মতো সাদা-কালো শিবিরে নাম লেখান জাতীয় দলের এই গোলরক্ষক। নতুন ক্লাবে যোগ দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জিকো বলেন, **‘অনেক আগেই আমার মোহামেডানে খেলার কথা ছিল, কিন্তু সেটি হয়নি। এখন মোহামেডানের হয়ে খেলতে পেরে ভালো লাগছে। আমরা নতুন ও পুরোনো খেলোয়াড়রা যদি মাঠে একসঙ্গে ভালো খেলতে পারি এবং সমর্থকদের সমর্থন পাই, তাহলে মোহামেডানের জন্য সব ট্রফি জিততে পারব বলে বিশ্বাস করি।’**
দলের শক্তিমত্তা বাড়লেও শিরোপা জিততে শৃঙ্খলা ও কঠোর অনুশীলনের বিকল্প দেখছেন না সোহেল রানা জুনিয়র। তাঁর ভাষায়, **‘বসুন্ধরা কিংসের আটজন খেলোয়াড়কে দলে নেওয়া এবং আগের বিদেশি খেলোয়াড়দের ধরে রাখায় মোহামেডান শক্তিশালী দল হয়েছে, যারা চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য লড়বে। আমরা একে অপরকে খুব ভালোভাবে চিনি। তবে চ্যাম্পিয়ন হতে হলে শৃঙ্খলা ও সঠিক অনুশীলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’**
ফয়সাল আহমেদ ফাহিমও এবার শিরোপা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। লিগ ও ফেডারেশন কাপ জয়ের অভিজ্ঞতা তাঁদের শিরোপার লড়াইয়ে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেবে বলে মনে করেন এই উইঙ্গার। তবে তাঁর মতে, দলের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে কোচের কৌশল এবং মাঠে খেলোয়াড়দের সেই পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন, তার ওপর।
শক্তিশালী দেশীয় খেলোয়াড়ের পাশাপাশি বিদেশি কোচ নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে মোহামেডানের। ক্লাবটির পরিচালক ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া জানিয়েছেন, উজবেকিস্তান অথবা ডেনমার্ক থেকে একজন বিদেশি কোচ আনার চেষ্টা চলছে। যদিও ফুটবলাঙ্গনে গুঞ্জন, বাফুফের সঙ্গে সমঝোতায় বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ মার্ক কক্সকে নিচ্ছে সাদা-কালো কর্মকর্তারা।
সব মিলিয়ে এবারের দলবদলে শুধু খেলোয়াড় সংগ্রহেই নয়, আয়োজনের ধরনেও পুরোনো মোহামেডানের ছাপ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে ক্লাবটি। তারকায় ঠাসা দল, জাতীয় দলের একঝাঁক খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের নতুন করে উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে সাদা-কালো শিবির এবার মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি হারানো জৌলুসও ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায়।
মোহামেডান স্কোয়াড:
গোলরক্ষক: সুজন হোসেন, আহসান হাবিব বিপু, আনিসুর রহমান জিকো, ইসমাইল হোসেন মাহিন।
ডিফেন্ডার: শাকিল আহাদ তপু, জাহিদ হাসান শান্ত, ইসমাইল হোসেন, শাহিন আহম্মদ, সাদ উদ্দিন, টনি আগাবাজি, রিমন হোসেন, রহমত মিয়া, আজিজুল হক অনন্ত, হাফিজুর রহমান বাবু।
মিডফিল্ডার: শাহরিয়ার ইমন, মেহেদি হাসান, কামাল মৃধা, সোহেল রানা, মিনহাজ আবেদিন, মেহেদি হাসান রয়েল, মোজাফ্ফর মোজাফ্ফরভ, মজিবুর রহমান জনি, শফিউল হোসেন।
ফরোয়ার্ড: রাজু আহমেদ, সৌরভ দেওয়ান, জুয়েল মিয়া, জয় আহমেদ, ফয়সাল আহমেদ ফাহিম, সুলেমানে দিয়াবাতে, রহিম উদ্দিন, আমির হাকিম বাপ্পি, এমানুয়েল সানডে, আরিফ হোসেন