ঐতিহাসিক শতক বাবা-মাকে উৎসর্গ করলেন তানজিদ
মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট। প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, ভেন্যু অস্ট্রেলিয়ার মাটি। সামনে আবার প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড, নাথান লায়নের মতো বিশ্বসেরা বোলিং আক্রমণ। এমন মঞ্চেই ব্যাট হাতে নিজের আগমনী বার্তা দিয়ে গেলেন তানজিদ হাসান তামিম। ডারউইনের আকাশে ইতিহাস লিখেছেন তিনি। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে ১৯৭ বলে ৮ চার ও ১ ছক্কায় ১০১ রানের ইনিংস খেলেছেন বাংলাদেশের এই বাঁহাতি ওপেনার। শুধু নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিই নয়, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার ইতিহাসও গড়েছেন তিনি।
তবে ব্যক্তিগত অর্জনের উচ্ছ্বাসের মাঝেও সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছে বাবা-মায়ের কথা। তাই ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট শতকটি উৎসর্গ করেছেন তাদেরই। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান তানজিদ। নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের জন্য দিনটা খুব ভালো গেছে। দ্বিতীয় টেস্টেই শতক করতে পারা আমার জন্য দারুণ একটি মুহূর্ত। এই শতকটা আমার বাবা-মাকে উৎসর্গ করতে চাই।’
ডারউইন টেস্টের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের নেতৃত্ব দেন তানজিদ। আগের দিন ৩২ রানে অপরাজিত থাকা এই ওপেনার ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও নিখুঁত শট নির্বাচনের মিশেলে খেলেন ১৯৭ বলে ১০১ রানের অসাধারণ ইনিংস। আটটি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো এই শতকে ভর করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চালকের আসনে উঠে আসে বাংলাদেশ। তানজিদের সঙ্গে দারুণ জুটি গড়ে ৮৪ রানের কার্যকর ইনিংস খেলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। দুই ব্যাটারের দৃঢ়তায় দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে ৬ উইকেটে ৩৫১ রান তোলে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে সফরকারীদের লিড দাঁড়ায় ১৫৩ রানে।
অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের পেস আক্রমণের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও প্যাট কামিন্সদের সামলানোর চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন বলেই সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তবে প্রতিপক্ষের নাম নয়, সব সময় বলের মান অনুযায়ী ব্যাটিং করতেই মনোযোগ ছিল তার, ‘নতুন বলে ওদের বিপক্ষে ব্যাটিং করা কঠিন ছিল। তবে আমি কখনো বোলার দেখে খেলি না। চেষ্টা করি বলের মেরিট অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে।’ শতক করে মাঠ ছাড়ার সময় গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে দর্শকদের করতালির অভ্যর্থনাও ছুঁয়ে গেছে তানজিদকে। সেই অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন,‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন পাওয়াটা সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি। খুব ভালো লেগেছে। আজ বুঝতে পেরেছি, টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য ঠিক কতটা গভীর।’
ম্যাচের পরিস্থিতি নিয়েও আশাবাদী এই ওপেনার। তার মতে, যত বেশি সময় বাংলাদেশ ব্যাটিং করতে পারবে, ততই সুবিধা হবে দলের জন্য। ‘আমরা যত বেশি ব্যাটিং করতে পারব, সেটাই দলের জন্য ভালো। সামনে এখনো তিন দিন আছে। যত বেশি রান করা যাবে, আমাদের বোলারদের জন্য কাজটা তত সহজ হবে।’
তাঁর এই দারুণ ইনিংস নজর এড়ায়নি অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তিদেরও। চ্যানেল সেভেনে তানজিদের ব্যাটিং দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং। তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করার মতো ভালো কিছু হতে পারে না! সেটাও মাত্র দ্বিতীয় টেস্টে। বাংলাদেশের ধীরগতির ও নিচু উইকেটে খেলে সে বড় হয়েছে। এখানে কন্ডিশন সম্পূর্ণ আলাদা, তবে সে চমৎকার খেলেছে। এটা এমন এক মুহূর্ত, যা সে কখনো ভুলবে না। সে বেশ ধৈর্যশীল। ডিফেন্সে পোক্ত। তাঁর টেকনিক খুবই সহজ, ভালো বলগুলো ডিফেন্ড করা আর খারাপ বলগুলোকে সীমানার বাইরে পাঠানো। তানজিদ আমাকে মুগ্ধ করেছে।’
ফক্স স্পোর্টসে তানজিদের ইনিংসের প্রশংসা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ওপেনার মার্ক ওয়াহ। তাঁর ভাষায়, ‘কী অসাধারণ এক মুহূর্ত! তার ক্যারিয়ারে পরবর্তীতে যা-ই ঘটুক না কেন, ডারউইনে করা সেঞ্চুরি সে কখনো ভুলবে না। বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে কী দারুণ এক ইনিংসই না খেলল!’
সেঞ্চুরির পর অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি উইকেটকিপার-ব্যাটার অ্যাডাম গিলক্রিস্টের সঙ্গেও কথা বলেছেন তানজিদ। নিজের ইনিংস নিয়ে আত্মতুষ্টির বদলে দলীয় প্রয়োজনকেই সামনে রেখেছেন তিনি। তানজিদ বলেন, ‘এটা আমার জন্য খুবই বিশেষ কিছু। দ্বিতীয় ম্যাচেই সেঞ্চুরি পাওয়া আমার জন্য খুবই বিশেষ ব্যাপার। দলের যেটা দরকার ছিল, সেটাই করার চেষ্টা করেছি। আমি স্বাভাবিক খেলাটা খেলার চেষ্টা করেছি। বেশি কিছু করার চেষ্টা করিনি।’