মঙ্গলবার বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে থাকবে না শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব, থাকবে একটি যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার নতুন অধ্যায়ের প্রতীকী সূচনা
লিওনেল মেসিকে ছাড়াই নিজেদের মাঠে গোলের উৎসব করল আর্জেন্টিনা। তবে প্রতিপক্ষের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এই ৭-০ গোলের জয়কে শুধুই বড় ব্যবধানের জয় হিসেবে দেখা যাচ্ছে না; বরং বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য ম্যাচটি হয়ে উঠেছিল নতুন ও তরুণ খেলোয়াড়দের যাচাইয়ের সুযোগ। খর্ব শক্তির বুর্কিনা ফাসোর বিপক্ষে সেই পরীক্ষায় বেশ কয়েকজন তরুণ নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ সময় রোববার সকালে বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে বুর্কিনা ফাসোকে ৭-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধেই পাঁচ গোল করে ম্যাচের ফল কার্যত নিশ্চিত করে ফেলে লিওনেল স্কালোনির দল। দ্বিতীয়ার্ধে আরও দুই গোল করে ব্যবধান বাড়ায় স্বাগতিকরা।
আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করেন লাউতারো মার্তিনেস, জানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি, নিকো পাস, হুলিয়ান আলভারেস, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো ও জুলিয়ানো সিমিওনে। একটি গোল আসে বুর্কিনা ফাসোর ডিফেন্ডার মুমুনি দিয়ালোয়ের আত্মঘাতী থেকে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার আক্রমণের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে আফ্রিকার দলটি। চতুর্থ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হলেও ফিরতি বলে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন লাউতারো। এরপর অষ্টম মিনিটে দিয়ালোয়ের আত্মঘাতী গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ হয়। ১৩ মিনিটে প্রেস্তিয়ান্নি করেন তৃতীয় গোল। নিকো পাস ও হুলিয়ান আলভারেসের গোলে প্রথমার্ধেই ৫-০ হয়ে যায় স্কোরলাইন।
বিরতির পর পাঁচটি পরিবর্তন আনেন স্কালোনি। তাতে আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধার কিছুটা কমলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই ছিল। ৫৮ মিনিটে মাস্তানতুয়োনো এবং যোগ করা সময়ে জুলিয়ানো সিমিওনের গোলে ৭-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত হয়।
তবে এই ম্যাচের ফলের দিকে তাকিয়ে আর্জেন্টিনার প্রকৃত শক্তি বিচার করা কঠিন। বুর্কিনা ফাসোর মূল দলই মাঠে নামতে পারেনি। মরক্কো থেকে আর্জেন্টিনায় আসার পথে তাদের চার্টার ফ্লাইট বাতিল ও ভ্রমণ-জটিলতা তৈরি হয়। নির্ধারিত সময়ের কয়েক দিন পর দলটি বুয়েনস এইরেসে পৌঁছায় এবং ম্যাচ শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মাঠে আসে। ক্লান্তি ও ভ্রমণ সমস্যার কারণে একাধিক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ও সফরে আসেননি। ফলে মূলত অনূর্ধ্ব-২৩ খেলোয়াড়দের নিয়ে দল সাজাতে হয় কোচ আমির আবদুকে।
এই পরিস্থিতির বিষয়টি আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনিও স্বীকার করেছেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, তরুণদের মাঠে নামিয়ে তাদের সুযোগ দেওয়াই ছিল অন্যতম লক্ষ্য। প্রথমার্ধে দল যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে খেলেছে, আর দ্বিতীয়ার্ধে পরিবর্তন এনে কয়েকজন তরুণকে অভিষেকের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তার মতে, তরুণরা দলে ‘সতেজতা ও খেলার ইচ্ছা’ যোগ করছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্কালোনি নিজেও এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিয়মিত খেলাকে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট মনে করছেন না। তিনি পরবর্তী আন্তর্জাতিক বিরতিতে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার আগ্রহ জানিয়েছেন। কারণ, দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বড় জয় আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে, কিন্তু বড় টুর্নামেন্টের বাস্তব পরীক্ষায় দলের সীমাবদ্ধতা বোঝার জন্য শক্ত প্রতিপক্ষ প্রয়োজন।
অন্যদিকে বুর্কিনা ফাসোর কোচ আমির আবদুর জন্য ম্যাচটির ফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল দলকে মাঠে নামাতে পারা। ভ্রমণ-জটিলতার কারণে শেষ মুহূর্তে তরুণদের নিয়ে দল সাজাতে বাধ্য হন তিনি। মূল দলের নিয়মিত খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতিতে এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ৭-০ হার তাই বুর্কিনা ফাসোর স্বাভাবিক শক্তির প্রতিফলন নয়। ম্যাচের আগে ভ্রমণসংক্রান্ত সংকট ও জরুরি দল গঠনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছে।
তবু আর্জেন্টিনার জন্য ম্যাচটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। মেসি-পরবর্তী প্রজন্মকে সামনে আনার প্রক্রিয়ায় স্কালোনি ধীরে ধীরে নতুন মুখদের সুযোগ দিচ্ছেন। প্রেস্তিয়ান্নির প্রথম আন্তর্জাতিক গোল, মাস্তানতুয়োনোর গোল এবং তরুণদের নিয়মিত মাঠে নামানোর মধ্য দিয়ে সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
বিশেষ করে প্রেস্তিয়ান্নির গোলটি ছিল উল্লেখযোগ্য। জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোল পাওয়ার পর তিনি জানান, এই মুহূর্তটি এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না এবং ছোটবেলা থেকে পরিবার তার প্রতিটি অর্জনের সঙ্গে ছিল।
অন্যদিকে মেসির বিদায়ের আবহ পুরো ম্যাচকেই আলাদা মাত্রা দিয়েছে। বুর্কিনা ফাসোর বিপক্ষে ম্যাচে মেসি খেলেননি। শুক্রবার আর্জেন্টিনায় পৌঁছানো এই মহাতারকার জাতীয় দলের শেষ ম্যাচ হবে আগামী মঙ্গলবার বেনিনের বিপক্ষে মনুমেন্টালেই। ৩৯ বছর বয়সী মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে ওই ম্যাচে। আর্জেন্টিনার হয়ে তার ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল এবং বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকাসহ একাধিক শিরোপা জয়ের অধ্যায়ও শেষ হতে যাচ্ছে।
স্কালোনির কাছে তাই বেনিন ম্যাচটি নিছক আরেকটি প্রীতি ম্যাচ নয়। বুর্কিনা ফাসোর বিপক্ষে জয়ের পর তিনি বলেছেন, মেসির বিদায়ের দিনটি সবার জন্য আবেগঘন ও স্মরণীয় হবে। তার ভাষায়, মনুমেন্টালে যদি পাঁচটি স্টেডিয়ামও থাকত, সেগুলো পূর্ণ হয়ে যেত—মেসিকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ এতটাই বেশি।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফের্নান্দেজও মেসির বিদায়ের প্রসঙ্গ তুলেছেন। তার মতে, মেসি চলে যাওয়ার পরও দলকে একই ধারায় প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি তিনি স্কালোনিকে ধরে রাখার পক্ষেও মত দিয়েছেন এবং বলেছেন, বর্তমান দলটির ভিত্তি কোচই তৈরি করেছেন।
সব মিলিয়ে বুর্কিনা ফাসোর বিপক্ষে ৭-০ জয় আর্জেন্টিনার জন্য নিঃসন্দেহে দারুণ একটি স্কোরলাইন। কিন্তু এই ম্যাচ থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রকৃত শক্তির মাপকাঠি বের করা কঠিন। প্রতিপক্ষের মূল দল অনুপস্থিত, ভ্রমণ-জটিলতায় বিপর্যস্ত এবং প্রায় শেষ মুহূর্তে মাঠে নামা একটি তরুণ দলকে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। বরং ম্যাচটির বড় প্রাপ্তি—মেসির বিদায়ের ঠিক আগে নতুন প্রজন্মকে আরও একবার পরীক্ষার সুযোগ পাওয়া।
এখন সেই প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা মঙ্গলবার। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে থাকবে না শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব। থাকবে একটি যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার নতুন অধ্যায়ের প্রতীকী সূচনা।