আর একটি ম্যাচ। আর ৯০ মিনিট। এরপরই সমাপ্তি ঘটবে আর্জেন্টিনার ফুটবলের এক ঝলমলে স্বর্ণালী অধ্যায়ের। বেনিনের বিপক্ষে মঙ্গলবার রাতে (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টা) বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি। বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরে অনুষ্ঠেয় ম্যাচটির মধ্য দিয়ে দেশের জার্সিতে দুই দশকের বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা।
শেষ ম্যাচের আগে জাতীয় দলের সঙ্গে শেষবারের মতো অনুশীলনও করেছেন মেসি। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে আর্জেন্টিনায় ফিরে নিজ শহর রোজারিওতে যান তিনি। স্ত্রী, তিন ছেলে ও মাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে সময় কাটানোর পর রোববার বুয়েনস এইরেসে ফেরেন এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) অনুশীলন ক্যাম্পে যোগ দেন। জাতীয় দলের অনুশীলনে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের পৌঁছানোর ছবি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ব্যাপক সাড়া ফেলে। সোমবার হবে ম্যাচের আগে দলের শেষ অনুশীলন।
বিদায়ী ম্যাচটিকে ঘিরে আর্জেন্টিনা সাজিয়েছে বিশেষ আয়োজন। মেসির শেষ ম্যাচের জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ সংস্করণের জার্সি। চিরচেনা আকাশি-সাদা রঙের এই জার্সিতে কেন্দ্রীয়ভাবে থাকবে আর্জেন্টিনার জাতীয় প্রতীক ‘সান অব মে’। জার্সির বিভিন্ন অংশে রয়েছে সোনালি অলংকরণ, সোনালি রঙের ১০ নম্বর ও মেসির নাম। বিশেষ এই জার্সি তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ রাতের স্মারক হয়ে থাকবে।
মেসির বিদায়কে স্মরণীয় করে তুলতে ম্যাচটিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের সদস্যদের পরিবারসহ। কাতারে মেসির সঙ্গে ইতিহাস গড়া সতীর্থরা তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের সাক্ষী থাকবেন। এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া জানিয়েছেন, মেসি আমন্ত্রণ গ্রহণ করার পরই বিশ্বকাপজয়ী দলের সব সদস্যকে পরিবারসহ এই বিশেষ আয়োজনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সতীর্থরাও ইতোমধ্যে মেসিকে ঘিরে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার নতুন অধিনায়ক হতে যাওয়া ক্রিস্তিয়ান রোমেরো জানিয়েছেন, মেসিকে তিনি কতটা ভালোবাসেন, তা কখনো ভাষায় প্রকাশ করতে পারেননি—এ আক্ষেপ তাঁর থেকে যাবে। মেসির পরামর্শ ও সমর্থন তাঁর জাতীয় দলের নেতৃত্ব পাওয়ার পথেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মেসির বিদায়ের পর রোমেরোর হাতেই অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড যাওয়ার কথা।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পথচলা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। দীর্ঘ এই যাত্রায় তিনি হয়ে উঠেছেন দলের রেকর্ড উপস্থিতির অধিকারী ও সর্বোচ্চ গোলদাতা। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি হবে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ২০৮তম উপস্থিতি। এখন পর্যন্ত ২০৭ ম্যাচে তাঁর গোল ১২৫টি। সঙ্গে রয়েছে ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ বিশ্বকাপের মতো বড় অর্জন।
তবে এই পথটা কখনোই মসৃণ ছিল না। একসময় জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর একপর্যায়ে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফিরে এসে বদলে দেন নিজের এবং আর্জেন্টিনার ইতিহাস। কোপা আমেরিকা জয় থেকে বিশ্বকাপ—ধীরে ধীরে সমালোচনার জায়গা দখল করে নেয় ভালোবাসা।
কাতারের সেই বিশ্বকাপ জয়ই যেন মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার অসমাপ্ত গল্পের পূর্ণতা এনে দেয়। যে শিরোপার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা, যে ব্যর্থতার ভার তাঁকে বহন করতে হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেই বিশ্বকাপ ট্রফিই তাঁর হাতে ওঠে। দেশের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও তখন নতুন মাত্রা পায়।
২০২৬ বিশ্বকাপের পর মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান। অবসরের কথা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, সিদ্ধান্তটি তাঁর হৃদয়ে ‘প্রচণ্ড কষ্ট’ দিয়েছে। কিন্তু এখন সরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে বলে মনে হয়েছে। জাতীয় দলের জার্সির জন্য তিনি সবসময় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
মেসি আরও বলেছিলেন, ফুটবলের মাধ্যমে যেন মানুষ ‘আর্জেন্টাইন হওয়ার জন্য গর্ববোধ’ করেন, সেই চেষ্টা তিনি সবসময় করেছেন। জাতীয় দলে থাকা তিনি ভালোবাসেন এবং সবসময় ভালোবাসবেন; তবে পেছন থেকে উঠে আসা তরুণদের জন্যও জায়গা করে দেওয়ার সময় এসেছে।
ভক্তদের উদ্দেশে তাঁর কৃতজ্ঞতার কথাও ছিল আবেগে ভরা। দুই দশক ধরে পাওয়া ভালোবাসার জন্য সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে মেসি বলেছিলেন, মাঠের ভেতর থেকে তাঁদের সমর্থনের শব্দ তিনি খুব মিস করবেন। এখন থেকে বাইরে থেকে একজন সমর্থক হিসেবে আর্জেন্টিনার পাশে থাকবেন—ভালো সময় হোক কিংবা খারাপ, সবসময়।
পরিবার, কোচ, সতীর্থ ও কর্মকর্তাদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি। সতীর্থদের সঙ্গে আর্জেন্টিনার হয়ে পাওয়া সাফল্যকে ‘স্বপ্নের মুহূর্ত’ উল্লেখ করে বলেন, এসব স্মৃতি নিয়ে তিনি শান্তি ও গর্বের সঙ্গে বিদায় নিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে পারাকে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর সেই আবেগঘন উচ্চারণ—‘আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ভামোস আর্জেন্টিনা।’
মেসির বিদায়ের আগে অবশ্য তাঁর অনুপস্থিতিতেও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে আর্জেন্টিনা। প্রথমে বলিভিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এরপর বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে পেয়েছে ৭-০ গোলের বড় জয়। তরুণদের নিয়ে নতুন যুগের আভাসও মিলেছে সেই ম্যাচগুলোতে।
এবার সেই নতুন যুগের দরজায় দাঁড়িয়ে পুরোনো যুগের মহানায়ক। মনুমেন্টালের গ্যালারি ভরে উঠবে হাজারো আকাশি-সাদা পতাকায়। উঠবে ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি। শেষবারের মতো ১০ নম্বর জার্সিতে মাঠে নামবেন সেই মানুষটি, যিনি একসময় আর্জেন্টিনার সমর্থকদের হতাশার কারণ ছিলেন, পরে হয়ে উঠেছেন তাঁদের সবচেয়ে বড় গর্বের নাম।
ম্যাচের বাঁশি বাজার পর শেষ হবে একটি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। কিন্তু শেষ হবে না গল্পটি। কারণ আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২০ বছরের বেশি সময়ের যাত্রা এখন আর শুধু পরিসংখ্যান নয়—এটি একটি প্রজন্মের স্মৃতি, কান্না, অপেক্ষা, ভালোবাসা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গল্প।