কিয়াউকফিউ বন্দর, অর্থনৈতিক করিডোর ও বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেইজিংয়ের স্বার্থ; বিশ্লেষকদের মতে, প্রভাব থাকলেও চীনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর কেটে গেছে প্রায় এক দশক। সংকটটি এখন দশম বছরে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। বিপরীতে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে, রাখাইনে সংঘাত থামেনি এবং নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে সংকটটি শুধু মানবিক সমস্যা নয়; বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে চীনের ভূমিকা আবারও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, মিয়ানমারের ওপর চীনের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে বেইজিংকে আরও সক্রিয় হতে হবে। চলতি বছর চীনা নেতৃত্বও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জুনের চীন সফরের সময় চীনা প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর তখন জানান, বেইজিং এ বিষয়ে তার ভূমিকা রাখার কথা জানিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন কেন আগ্রহী হবে? বাংলাদেশের মানবিক চাপ কমানোই কি বেইজিংয়ের একমাত্র বিবেচনা? নাকি এর সঙ্গে চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও জড়িয়ে আছে?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির ডিরেক্টর অব স্পেশাল ইনিশিয়েটিভস ড. আজিম ইব্রাহিমের বিশ্লেষণ, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহায়তা করলে চীন একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে লাভবান হতে পারে। *আরব নিউজে* প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে তিনি বলেন, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে যে অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, তার বাস্তবায়নের জন্য রাখাইনে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতি সেই পরিবেশের বিপরীত।
চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের কেন্দ্রে রয়েছে রাখাইন।
মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর এবং বঙ্গোপসাগর থেকে চীনের ইউনান পর্যন্ত তেল ও গ্যাস পাইপলাইন বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের বিভিন্ন প্রকল্প এগিয়ে নিতে দুই দেশ চলতি বছরও অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
রাখাইনে স্থিতিশীলতা না ফিরলে এসব প্রকল্পের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধান চীনের কাছে মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক যোগাযোগ সুরক্ষার প্রশ্নও হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আশফাক জামানও মনে করেন, রাখাইনে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্ন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৫ সালে *সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে* লেখা এক বিশ্লেষণে তিনি বলেন, কিয়াউকফিউ বন্দর এবং রাখাইনের তেল-গ্যাস পাইপলাইন চীনের ভারত মহাসাগরীয় যোগাযোগ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই প্রকল্পগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য রাখাইনে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এ কারণেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চীনের জন্য শুধু মানবিক বিষয় নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়ও।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—চীনের প্রভাব কি বাস্তবে মিয়ানমারের নীতি বদলে দেওয়ার মতো যথেষ্ট?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সি আর আবরারের বিশ্লেষণে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে উঠে এসেছে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কিছু পার্থক্য থাকলেও দুদেশই মূলত মিয়ানমারের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করে। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠতার কারণে বেইজিংয়ের প্রভাব রয়েছে, কিন্তু সেই প্রভাবকে অসীম মনে করার সুযোগ নেই।
এই সীমাবদ্ধতাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০১৯ সালে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় কাঠামো তৈরি হয়েছিল। চীনের মধ্যস্থতায় প্রত্যাবাসনের জন্য তালিকা যাচাই এবং রাখাইনে পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও সেই প্রক্রিয়ায় নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে চীনের কূটনৈতিক উদ্যোগ থাকলেই যে প্রত্যাবাসন হবে, এমন নিশ্চয়তা আগের অভিজ্ঞতা দেয় না।
২০২৫ সালে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মালয়েশিয়ার মুসলিম ওয়ার্ল্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান গবেষক প্রফেসর ইশারাফ হোসাইন বলেন, মিয়ানমার ও আসিয়ানের সঙ্গে চীনের শক্তিশালী সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে সংকট সমাধানে বেইজিংয়ের নেতৃত্বমূলক ভূমিকার সক্ষমতা রয়েছে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে চীন সমন্বিত উদ্যোগ নিলে বাস্তবসম্মত সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি বিষয়ে যথেষ্ট মিল রয়েছে—চীনের হাতে অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি যোগাযোগ ও প্রভাবের উপায় রয়েছে। কিন্তু সেই প্রভাবকে রাজনৈতিক সমাধানে রূপান্তর করাই মূল চ্যালেঞ্জ। কারণ রাখাইনের পরিস্থিতি ২০১৭ সালের তুলনায় এখন অনেক বেশি জটিল।
তখন আলোচনার প্রধান পক্ষ ছিল মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনী। এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে রাখাইনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতা অনেকাংশে বদলে গেছে। গবেষকদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হচ্ছে, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়া এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থানের কারণে শুধু নেপিদোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করা কঠিন হয়ে উঠেছে। এ কারণে চীনের জন্যও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বেইজিংয়ের ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও রাখাইনের মাঠপর্যায়ে কার হাতে কতটা নিয়ন্ত্রণ—সেটি এখন আলাদা প্রশ্ন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জন্নাতুল ফেরদৌসও চীনের ভূমিকার এই সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বেইজিংকে কূটনৈতিক প্রবেশাধিকার দিয়েছে, কিন্তু সেই প্রবেশাধিকার মানেই সীমাহীন প্রভাব নয়। মিয়ানমার বা রাখাইনের কোনো পক্ষের ওপর নিজের সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা চীনের নেই। তাঁর মতে, চীনের ভূমিকা পরিমাপ করা উচিত শুধু রাজনৈতিক আশ্বাস বা বিবৃতির ভিত্তিতে নয়; বরং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ তৈরিতে বেইজিং কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, সেটিই হবে মূল পরীক্ষা।
এখানে বাংলাদেশের স্বার্থও সরাসরি জড়িয়ে আছে। প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ফলে কক্সবাজারে জনসংখ্যার চাপ, পরিবেশগত ক্ষতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় শরণার্থী ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘ ও অংশীদার সংস্থাগুলো ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের আবেদন করেছে। এই চাপের মধ্যেই চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা বাংলাদেশের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে বাংলাদেশের জন্য চীনকে একমাত্র ভরসা হিসেবে দেখার ঝুঁকিও রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গবেষণায় এমন মতও রয়েছে যে, বাংলাদেশকে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ান ও জাতিসংঘ—সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। কারণ রাখাইন এখন শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের সমস্যা নয়; এটি ভারত ও চীনের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ সিরাজের ২০২৬ সালের এক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, চীন অতীতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপ সহজ করার চেষ্টা করলেও কার্যকর প্রত্যাবাসন এগোয়নি। তাঁর মতে, বেইজিংয়ের প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর একটি হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং কিয়াউকফিউ বন্দর ও জ্বালানি করিডোরের মতো কৌশলগত অবকাঠামো সুরক্ষা। ফলে রোহিঙ্গা অধিকার ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে চীনের চাপ প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই জায়গাটিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
চীন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখলে তার নিজস্ব স্বার্থও রক্ষা হবে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই স্বার্থ বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সব ক্ষেত্রে অভিন্ন নয়। বাংলাদেশের অগ্রাধিকার নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন; চীনের অগ্রাধিকার হতে পারে একই সঙ্গে রাখাইনে স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো সুরক্ষা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখা।
দুই পক্ষের স্বার্থ যেখানে মিলে যায়, সেখানেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে রয়েছে রাখাইনে সংঘাত কমানো, স্থানীয় অর্থনীতি পুনর্গঠন, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি। কিন্তু যেখানে স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে—বিশেষ করে নাগরিকত্ব, জবাবদিহি, রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে—সেখানে বাংলাদেশের অবস্থানকে স্পষ্ট রাখতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গবেষকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, অবকাঠামো নির্মাণ আর টেকসই প্রত্যাবাসন এক জিনিস নয়। রাস্তা, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা শিল্পাঞ্চল তৈরি করা সম্ভব; কিন্তু রোহিঙ্গারা সেখানে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন কি না, তাদের চলাচলের স্বাধীনতা থাকবে কি না, নাগরিকত্ব বা আইনি মর্যাদা কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। সুতরাং চীনের সামনে এখন একটি জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। একদিকে তার রয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক সম্পর্ক। রাখাইনে রয়েছে কিয়াউকফিউ বন্দর ও চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের মতো বড় প্রকল্প। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে চীনের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত আগ্রহ রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধান হলে এসব স্বার্থের অনেকগুলোই একই সঙ্গে সুরক্ষিত হতে পারে। রাখাইনে স্থিতিশীলতা ফিরলে চীনা বিনিয়োগের ঝুঁকি কমবে, বাংলাদেশে শরণার্থীদের চাপ কমবে, মিয়ানমারের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সুযোগ বাড়বে এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন যোগাযোগের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
কিন্তু সফলতার শর্তও কঠিন। শুধু নেপিদোর সঙ্গে সমঝোতা নয়; রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রত্যাবাসনের পর জীবিকা ও নাগরিক মর্যাদার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের বক্তব্যে তাই একটি বিষয় স্পষ্ট—চীন এই সংকটের **সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী**, কিন্তু একক সমাধানদাতা নয়। বাংলাদেশের জন্যও চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনীতির বিকল্প হতে পারে না।
প্রায় এক দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, রোহিঙ্গাদের শুধু সীমান্ত পার করে ফিরিয়ে দেওয়া গেলেই সংকটের সমাধান হবে না। সমাধান তখনই টেকসই হবে, যখন রাখাইনে এমন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি হবে যেখানে রোহিঙ্গারা নিজেদের ঘরে ফিরে গিয়ে নিরাপত্তা, অধিকার, জীবিকা ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবেন।
আর সেই বাস্তবতা তৈরি হলে লাভবান হবে শুধু বাংলাদেশ বা রোহিঙ্গারা নয়—মিয়ানমার এবং চীনও। চীনের জন্য সেটিই হতে পারে রোহিঙ্গা সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখার সবচেয়ে বড় ‘বহুমাত্রিক’ লাভ।