জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বাংলাদেশ বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণই দেশের সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি।
ভাষণের শুরুতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের অবদানও স্মরণ করেন তিনি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বাংলাদেশ বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি নির্বাচনে অংশ নেয়া জনগণকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।’
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেকে কিছুটা স্মৃতিকাতর বলেও উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, একই মঞ্চে তার বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের জনগণ ও দেশের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। আজ তিনিও দেশের জনগণের স্বার্থে এবং একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বসমাজের প্রত্যাশায় জাতিসংঘের এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন।
বিশ্বায়নের এই সময়ে বিশ্বের এক প্রান্তের ঘটনাও অন্য দেশগুলোকে কমবেশি প্রভাবিত করছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মানবসৃষ্ট বিভিন্ন সংঘাতের কারণে বিশ্বের অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট।
যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিও তীব্র চাপের মুখে পড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে বলেও জানান তিনি।
সংঘাত নিরসনে আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।’
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেয়া বক্তব্যে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে এই সমর্থন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব মানবতা এবং বিশ্ব শান্তির প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগের পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন আমি আজ আবারো পুনর্ব্যক্ত করছি। স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিবাদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি। আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা। একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায় ।’
জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে তারেক রহমান বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেয়ার প্রবণতা বিশ্বশান্তির অন্তরায়। শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে, জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All’ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল। ‘সবিল্ডিং কমিশনে’র ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।’
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশ এ বছর ‘উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণা’র ৪০তম এবং ‘ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা’র ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে।
অভিবাসন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘অভিবাসন প্রক্রিয়া মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিশ্বের অনেক দেশেই অভিবাসীগণ তাদের জন্মভূমি এবং অভিবাসিত দেশ; উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতা আশা করে।’