১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর মরদেহ পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মোজাফফর হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রসিকিউটর তানভীর হাসান বলেন, গত ১৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত সংস্থায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় মোজাফফর জানিয়েছেন, তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান তাঁকে জিয়াউর রহমানের মরদেহ পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে মোজাফফর সেই নির্দেশ পালন না করে মরদেহ দাফন করেন বলে তাঁর জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানান প্রসিকিউটর। তানভীর হাসান বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যার পর সকাল ১০টার দিকে মোজাফফর সৈনিকদের নিয়ে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যান। সেখান থেকে জিয়ার মরদেহ নিয়ে পাহাড়ের দিকে যান। কিন্তু মরদেহ পাহাড় থেকে না ফেলে একজন ইমামকে ডেকে এনে জিয়াসহ তিনজনের মরদেহ একটি কবরে দাফন করা হয়। ওই ইমামকে দাফন করা ব্যক্তিদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন—এ তথ্য জানানো হয়নি বলেও মোজাফফর জানিয়েছেন।
মোজাফফর হোসেনকে গত ১৫ জুলাই রাজধানীর বনানী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ৪৫ বছর পর তাঁকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। তিনি বর্তমানে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায়ও কারাগারে রয়েছেন। জিয়াউর রহমান হত্যা এবং ওই মামলার বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে এর আগে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
এর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর মোজাফফরকে জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জানিয়েছিলেন, তাঁর জবানবন্দিতে জিয়াউর রহমানকে গুলি করার বিষয়ে তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমানের নাম এসেছে। একই জিজ্ঞাসাবাদে মোজাফফর দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের দুই দিন আগে, ২৮ মে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। এসব তথ্য মোজাফফরের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া দাবি হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল সেনা কর্মকর্তার হামলায় নিহত হন। পরে তাঁর মরদেহের সন্ধান ও দাফন নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ববর্তী বিভিন্ন নথি ও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমানের মরদেহ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এলাকার একটি কবর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে মরদেহ ঢাকায় এনে রাষ্ট্রীয়ভাবে দাফন করা হয়।
মোজাফফরের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর আগের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশিত কিছু বর্ণনারও মিল রয়েছে। জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন মেজর মোজাফফরের ওপর জিয়ার মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল এবং কর্নেল মতিউর তাঁকে মরদেহ পাহাড়ের খাদে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন বর্ণনা আগে থেকেই বিভিন্ন সূত্রে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক জিজ্ঞাসাবাদে মোজাফফরের বক্তব্যের মাধ্যমে ওই ঘটনার বিষয়ে নতুন করে তথ্য সামনে এসেছে।
প্রসিকিউটর তানভীর হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, মোজাফফরের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেছেন, ১৯৯৭ বা ১৯৯৮ সালের দিকে দেশে ফিরে মোজাফফর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে দেখা করেছিলেন। সেখানে সেনাবাহিনীতে আত্মসমর্পণ ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে কথা হয় বলেও প্রসিকিউটর জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে সেনা সদরে চিঠি দেওয়া হলেও মোজাফফরের সেনাবাহিনীতে যোগদানের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। এরপর তিনি বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হন।
তবে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৪৫ বছর পর জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া এসব বক্তব্যের পূর্ণ সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। মোজাফফরের বক্তব্যের পাশাপাশি অন্যান্য নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য ও ঐতিহাসিক দলিল যাচাই করেই হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে।
নতুন এই বক্তব্যে বিশেষভাবে সামনে এসেছে হত্যার পর রাষ্ট্রপতির মরদেহ সরিয়ে নেওয়া, দাফনের স্থান এবং তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশের বিষয়টি। ফলে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত অধ্যায়ের আরও কিছু তথ্য তদন্তের আওতায় আসতে পারে।