নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার ওপর হামলার ঘটনায় থানার ভেতরে দাঁড়িয়ে ‘কর্মীর গায়ে হাত তুললে থানার ইট খুলে নেওয়ার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দলটির নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির আহ্বায়ক যুবাইর সরদার। এ সময় তাঁকে ‘লাশের বদলে লাশ নেওয়ার’ কথাও বলতে শোনা যায়।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাতে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের ১৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি এনসিপির নেতা-কর্মীরাই ফেসবুকে পোস্ট করেছেন বলে জানা গেছে।
ভিডিওতে উত্তেজিত কণ্ঠে যুবাইর সরদারকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি যুবাইর সরদার, নারায়ণগঞ্জ এনসিপির আহ্বায়ক। যদি আমার একটা কোনো কর্মীর গায়ে হাত তোলে, লাশের বদলে লাশ নিবো। আমার একজন নেতা-কর্মীর গায়ের রক্ত পড়ে আরেকবার, থানার ইটকল পর্যন্ত খুলে নেবো।’
থানার ভেতরে পুলিশের কর্মকর্তার কক্ষের সামনে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুব আলম বলেন, তিনি ওই বক্তব্য শুনেননি। ওই সময় তিনি তাঁর কক্ষের ভেতরে ছিলেন।
ওসি বলেন, ‘এই ধরনের বক্তব্য কেউ দিয়েছে কিনা আমি তা শুনিনি। তখন আমি ভেতরে ছিলাম। কিন্তু এমন বক্তব্য কেউ দিয়ে থাকলে তা ভালো চর্চা নয়। ওনারা দায়িত্বশীল পদে অবস্থান করে এভাবে থানার ভেতরে বক্তব্য রাখতে পারেন না।’
এ ধরনের বক্তব্যের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হলে যুবাইর সরদার তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। তাঁর দাবি, হামলার ঘটনার পর কয়েকজন নেতা-কর্মী ক্ষুব্ধ হয়ে ওসির কক্ষে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের শান্ত করার চেষ্টা করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছিল না।
যুবাইর সরদার বলেন, একপর্যায়ে ওসি মাহবুব আলম তাঁকে নেতা-কর্মীদের শান্ত করার জন্য অনুরোধ করেন। তাঁর ভাষ্য, ‘ওসি সাহেব নিজেই আমাকে বলেন, ভাই, আপনি একটু গিয়ে তাদের শান্ত করেন। এমপি সাহেব নেই, আপনার কথা তারা শুনবে। তখন আমি নেতা-কর্মীদের শান্ত করার জন্যই বলি, তোমরা শান্ত হও, আমরা আছি।’
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় যুবাইর আরও বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা পুলিশের সঙ্গে বিশৃঙ্খলায় জড়ানোর কথা তিনি বলেননি। বরং পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপের দিকে না যায়, সে জন্যই নেতা-কর্মীদের থামানোর চেষ্টা করেছেন।
এর আগে সোমবার রাত ৮টার দিকে ফতুল্লা থানাধীন বক্তাবলী বাজার এলাকায় হামলার শিকার হন এনসিপির নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক তাওহীদুল ইসলাম।
এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, ধলেশ্বরী নদীর তীরে অবৈধভাবে মাটি কাটার বিষয়ে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হালিম আজাদের নির্দেশে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাওহীদুল ইসলামের ওপর হামলা চালান। তবে হামলার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য জানা যায়নি।
হামলার পর এনসিপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা ফতুল্লা মডেল থানায় জড়ো হন। তাঁরা থানার ভেতরে অবস্থানের পাশাপাশি থানার সামনে মিছিল করেন এবং বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
পরে রাতে সেখানে যান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন। এ সময় হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান দলটির নেতা-কর্মীরা।
রাতেই এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়। জাতীয় যুবশক্তির নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হাসান বাদী হয়ে বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হালিম আজাদসহ ১৬ জন বিএনপি নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলাটি করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানিয়েছেন ওসি মোহাম্মদ মাহবুব আলম।
হামলার অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে থানায় নেতা-কর্মীদের অবস্থান এবং থানার ভেতরে যুবাইর সরদারের দেওয়া বক্তব্য—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে অবনতির দিকে না যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।