২০০৮–২০২০ সালে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের দাবি, ১০ ও ১৬ বছর পূর্তির সুবিধা আটকে আছে; পুনর্বিবেচনার দাবি শিক্ষক নেতাদের
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতনস্কেল উন্নীত হওয়াকে কেন্দ্র করে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে। শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষক চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেড পাচ্ছেন না। এতে দীর্ঘদিন চাকরি করেও তাঁদের বেতন ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না।
শিক্ষকদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘উন্নীত স্কেল’ ও ‘উচ্চতর গ্রেড’ হিসাবের পদ্ধতি। তাঁদের বক্তব্য, কোনো পদের বেতনস্কেল উন্নীত হওয়া এবং নির্দিষ্ট সময় সন্তোষজনক চাকরি করার পর একজন কর্মীর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার অধিকার এক বিষয় নয়। কিন্তু এ দুই বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করায় অনেক শিক্ষক তাঁদের চাকরিকালের ভিত্তিতে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রাথমিক শিক্ষক নেতাদের দাবি, সমস্যাটি সমাধানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, পদের বেতনস্কেল পরিবর্তনের তারিখের পরিবর্তে শিক্ষকের প্রথম নিয়োগের তারিখ ও চাকরিকাল বিবেচনায় নিয়ে উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণ করা উচিত।
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি না হলে নির্দিষ্ট সময় সন্তোষজনক চাকরি শেষে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের একটি বড় অংশ উন্নীত স্কেলের কারণে এ সুবিধা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, উন্নীত স্কেল মূলত কোনো পদের বেতন কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে উচ্চতর গ্রেড নির্দিষ্ট সময় চাকরি করার পর কর্মীর আর্থিক অগ্রগতির সুযোগ। দুটি বিষয়কে এক করে দেখার কারণে শিক্ষকদের প্রাপ্য সুবিধা আটকে আছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি
শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড নিয়ে জটিলতার কেন্দ্রে রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি ব্যাখ্যা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কোনো পদের মূল বেতনস্কেল উন্নীত হলে উন্নীতকরণের তারিখ থেকে পরবর্তী ১০ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
শিক্ষক নেতাদের বক্তব্য, এই ব্যাখ্যার ফলে কিছু শিক্ষকের ক্ষেত্রে প্রথম নিয়োগের তারিখ থেকে চাকরিকাল গণনার পরিবর্তে বেতনস্কেল উন্নীত হওয়ার তারিখকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মতে, এতে চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার হিসাব জটিল হয়ে পড়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের যুক্তি, সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩তম গ্রেডে উন্নীত করার ফলে তাঁদের পদ বা শ্রেণির পরিবর্তন হয়নি। তাই আগের চাকরিকাল বিবেচনায় নিয়ে ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের চিঠিপত্র ও সর্বশেষ সিদ্ধান্তের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ্যে না থাকায় জটিলতার চূড়ান্ত প্রশাসনিক অবস্থান নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তবে শিক্ষক নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি এখনো তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নিষ্পত্তি হয়নি।
মূল বেতনের পাশাপাশি ভাতায়ও প্রভাব
উচ্চতর গ্রেড কার্যকর না হওয়ার কারণে শিক্ষকরা শুধু মূল বেতনেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না বলে দাবি করেছেন শিক্ষক নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, বেতননির্ভর বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার পরিমাণেও এর প্রভাব পড়তে পারে। কিছু ভাতার ক্ষেত্রে পরে বকেয়া সমন্বয়ের সুযোগ না থাকায় আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি বলেন, চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড না পাওয়া কেবল প্রশাসনিক জটিলতা নয়; এটি শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। তাঁর দাবি, সময়মতো গ্রেড কার্যকর না হওয়ায় শিক্ষকদের মাসিক বেতনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কিছু ভাতাও কমে যাচ্ছে। লিপি বলেন, পরে বকেয়া বেতন সমন্বয় করা গেলেও সব আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে একই সুযোগ থাকে না। ফলে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে শিক্ষকদের একটি অংশের আর্থিক ক্ষতি স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
তবে উচ্চতর গ্রেড কার্যকর না হওয়ায় কোন শিক্ষক কত টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং কতজন শিক্ষক সরাসরি এর আওতায় রয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সরকারি তথ্য ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিধানের বিস্তারিত যাচাই প্রয়োজন।
জ্যেষ্ঠ-নবীন শিক্ষকদের বেতনের ব্যবধান কমার অভিযোগ
শিক্ষক নেতাদের দাবি, দীর্ঘদিন চাকরি করা শিক্ষকদের সঙ্গে নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের বেতনের ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রে কমে এসেছে। তাঁদের বক্তব্য, চাকরিকালের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের একাধিক ধাপ এগিয়ে থাকার কথা থাকলেও উচ্চতর গ্রেডের হিসাব নিয়ে জটিলতায় অনেকে প্রত্যাশিত আর্থিক অগ্রগতি পাচ্ছেন না। তাঁদের মতে, বেতনস্কেল উন্নীত হওয়ার সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত চাকরিকালের ভিত্তিতে উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণের বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তা না হলে দীর্ঘদিন চাকরি করা শিক্ষক ও তুলনামূলক নবীন শিক্ষকদের মধ্যে বেতনের কাঙ্ক্ষিত পার্থক্য বজায় রাখা কঠিন হবে।
স্পষ্ট নির্দেশনার দাবি
শিক্ষক নেতারা বলছেন, সমস্যার সমাধানে উন্নীত স্কেল ও উচ্চতর গ্রেডের হিসাবের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রথম নিয়োগের তারিখ, চাকরিকাল এবং বেতনস্কেল উন্নীত হওয়ার প্রভাব কীভাবে বিবেচিত হবে, তা নিয়ে অভিন্ন লিখিত নির্দেশনা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা শিক্ষকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা কমবে। পাশাপাশি একই ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা থেকে সৃষ্ট জটিলতাও দূর করা সম্ভব হবে।
২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেডের দাবি নিষ্পত্তিতে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—চাকরিকালের হিসাব প্রথম নিয়োগের তারিখ থেকে হবে, নাকি পদের বেতনস্কেল উন্নীত হওয়ার তারিখ থেকে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত ও স্পষ্ট সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে শিক্ষকদের দাবি কীভাবে নিষ্পত্তি হবে।