এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ফলের বড় অবনতি হয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা ২০০৪ সালের পর সর্বনিম্ন। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জনের মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুই পরীক্ষার্থীর একজন পাস করতে পারেনি। ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি)—এই দুই বিষয়েই ফেল করেছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন।
শুধু পাসের হার নয়, কমেছে সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। এক বছরে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন, প্রায় ৪২ শতাংশ। গত বছরের ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট।
ফলাফলের এই অবনতির পেছনে একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি, ইংরেজি ও আইসিটিতে দুর্বলতা, উত্তরপত্র মূল্যায়নের পদ্ধতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ—সবই আলোচনায় এসেছে। তবে এসব কারণের কোনটি কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নির্ধারণে বিস্তারিত বিষয়ভিত্তিক ফল ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিয়ে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ইংরেজি ও আইসিটিতে বেশি বিপর্যয়
এবার সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে ইংরেজিতে। এ বিষয়ে ফেল করেছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন। আইসিটিতে অকৃতকার্য হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয়ে মোট অকৃতকার্যের সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। অর্থাৎ মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশের ফল খারাপ হয়েছে এই দুই বিষয়ে।
ইংরেজি ও আইসিটিতে এমন ফল শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে শুধু ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে বিষয় দুটির সামগ্রিক দুর্বলতা নির্ধারণ করা যায় না; সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মোট পরীক্ষার্থী, পাসের হার, নম্বরের বণ্টন এবং আগের বছরের তুলনামূলক তথ্যও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও প্রস্তুতির চাপ
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি অংশের মতে, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির চাপ বেড়েছে। বড় সিলেবাসের সব বিষয় যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে নিয়মিত ক্লাস, অনুশীলন ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় প্রয়োজন। প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকলে বিশেষ করে ইংরেজি ও আইসিটির মতো বিষয়ে তার প্রভাব পড়তে পারে।
এবার সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নের ধরন ও মানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সামঞ্জস্যও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অভিন্ন প্রশ্নপত্রই ফল খারাপ হওয়ার কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রশ্নের মান, বিষয়ভিত্তিক ফল এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির তুলনামূলক মূল্যায়ন জরুরি।
খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা
উত্তরপত্র মূল্যায়নের পদ্ধতিকেও ফলের অবনতির আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এবার খাতা মূল্যায়নে ঢালাওভাবে বাড়তি নম্বর দেওয়ার পরিবর্তে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণের প্রবণতা ছিল। পরীক্ষার্থীরা খাতায় যা লিখেছে, তার ভিত্তিতেই নম্বর দেওয়ার ফলে আগের তুলনায় পাসের হার কমে থাকতে পারে।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীনও বলেছেন, শিক্ষার্থীরা খাতায় যেমন লিখেছে, সেভাবেই নম্বর পেয়েছে; কাউকে বাড়তি নম্বর দেওয়া হয়নি। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজার ভাষ্য, ফল যথাযথ পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন ঘটে।
তবে মূল্যায়নের কঠোরতা এবং মূল্যায়নে ত্রুটি—দুটি আলাদা বিষয়। কোনো শিক্ষার্থী প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর পেলেই মূল্যায়নে ভুল হয়েছে, এমন বলা যায় না। আবার উত্তরপত্রে ভুল থাকলে তা শনাক্ত করার ব্যবস্থাও থাকা জরুরি। এ জন্য ১ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষার আবেদন নেওয়া হবে। পুনর্নিরীক্ষার পর কতজনের ফল পরিবর্তন হয়, তা থেকে মূল্যায়ন নিয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
কলেজের পরিবেশ ও নিয়মিত পড়াশোনার প্রশ্ন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশও ফলাফলের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, ক্লাসে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নিয়মিত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক অনুশীলন, শিক্ষকের তত্ত্বাবধান এবং পরীক্ষার আগে ধারাবাহিক প্রস্তুতি—উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো ফলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানে এসব কার্যক্রম ব্যাহত হলে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তবে সারা দেশের ফল বিপর্যয়ের পেছনে কলেজবিমুখতা বা রাজনৈতিক অস্থিরতাকে প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে উপস্থিতির হার, পাঠদানের সময়সূচি এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির তথ্য দরকার।
বোর্ডভেদে ফলের বড় ব্যবধান
এবার সব সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই পাসের হার কমেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে বেশি, ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে বরিশাল বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে কম, ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। দুই বোর্ডের ব্যবধান প্রায় ১৭ শতাংশ পয়েন্ট।
ঢাকা বোর্ডে গত বছর পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এবার কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ পয়েন্ট। বরিশাল বোর্ডে গত বছরের ৬২ দশমিক ৫৭ শতাংশ থেকে পাসের হার নেমেছে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে—কমেছে ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ পয়েন্ট। ফলে বোর্ডভিত্তিক অবনতির মাত্রা যে এক রকম নয়, তা স্পষ্ট।
চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। বোর্ডটির গত ১৫ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ। বোর্ডটিতে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬১ হাজার ৮৯৪ জন। পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে থাকায় বোর্ডটির ফলও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বরিশাল বোর্ডে ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। সারা দেশের হিসাবে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯৩, গত বছর ছিল ২০২। অর্থাৎ এক বছরে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, শিক্ষকসংকট, পাঠদানের পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মানবিক বিভাগে পাসের হার কম
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, মানবিক বিভাগে পাসের হার ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ বিভাগে ছাত্রদের মধ্যে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩২ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়, পাস করেছে ৯০ হাজার ৬৬৪ জন। ছাত্রীদের মধ্যে পরীক্ষার্থী ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৩ জন; পাস করেছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৭ জন।
বিভাগভিত্তিক এই ফল মানবিকের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, বিষয় নির্বাচন, পাঠদানের মান এবং মূল্যায়নের ধরন নিয়ে আরও বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে শুধু পাসের হার দিয়ে শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা কিংবা কোনো বিভাগের শিক্ষার মান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
পুনঃপরীক্ষা ও পুনর্নিরীক্ষায় নজর
ফল প্রকাশের পর অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের সম্ভব হলে এক মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আলোচনা করা হচ্ছে। কত দিনের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া হবে, তা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পাশাপাশি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষার ফলও গুরুত্বপূর্ণ। পুনর্নিরীক্ষায় নম্বর বা গ্রেড পরিবর্তন হলে মূল্যায়নপ্রক্রিয়ার সম্ভাব্য অসংগতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। তবে ফলের সামগ্রিক অবনতি কাটাতে শুধু পুনর্নিরীক্ষা বা পুনঃপরীক্ষা যথেষ্ট নয়। বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা, নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি বাড়ানো এবং যেসব প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি সেগুলোর সমস্যা নির্ণয় করা প্রয়োজন।
এবারের ফল তাই শুধু পাসের হার কমার পরিসংখ্যান নয়; এটি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি, পাঠদানের কার্যকারিতা ও মূল্যায়নব্যবস্থা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন সামনে এনেছে। কোন কারণে কতটা অবনতি হয়েছে, তা নির্ধারণে শিক্ষা বোর্ডের বিষয়ভিত্তিক ফল, পুনর্নিরীক্ষার তথ্য এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিশ্লেষণ জরুরি।