সরকারি সহায়তা ছাড়াই ৬০ শতাংশ জমি কিনলেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের বাবুপুরের বাসিন্দারা, পাশে আরও জমি কেনার পরিকল্পনা
প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষের বাস বাবুপুর গ্রামে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেখানে খেলাধুলার জন্য কোনো স্থায়ী মাঠ ছিল না। বর্ষা শেষে ধান কাটার পর সাময়িকভাবে ফাঁকা জমিতে শিশুরা খেলার সুযোগ পেলেও চাষাবাদ শুরু হলেই তা বন্ধ হয়ে যেত। তাই নিজেদের উদ্যোগে মাঠের জন্য জমি কিনেছেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দারা। ধনী-গরিবের সম্মিলিত চাঁদায় কেনা হয়েছে ৬০ শতাংশ জমি। সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই এমন উদ্যোগে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় গ্রামজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ।
সংকট মেটাতে গ্রামের ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলম ও উদ্যোক্তা এস এম ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বে একটি মতবিনিময় সভা করেন গ্রামবাসী। উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম জানান, ‘গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রামবাসীর মতবিনিময় সভায় খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার সিদ্ধান্ত হয়। সভায় উপস্থিত সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।’ ইকবাল মাহমুদ, আজাহার শিকদার, সেলিম আল মামুন, মিজানুর রহমান, মজনু শিকদার, শফিকুল ইসলাম ও শুভ প্রামাণিকসহ অনেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এগিয়ে আসেন। কেউ দিয়েছেন ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ বা এক হাজার টাকা। কেউ আবার দুই হাজার, পাঁচ হাজার কিংবা ১০ হাজার টাকা দিয়ে অংশ নিয়েছেন এই উদ্যোগে।
সব মিলিয়ে সংগৃহীত টাকা দিয়ে ৩০ লাখ ৬৮ হাজার টাকায় ৫৯ শতাংশ জমি কেনা হয়। আর এক শতাংশ জমি বিনা মূল্যে দান করেন জমির মালিক ইকবাল হোসেন। গত ২৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে গ্রামবাসীর কাছে এই মাঠ বুঝিয়ে দেয়া হয়।
জমি বুঝে নেওয়ার দিন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে সেখানে জড়ো হন গ্রামের বাসিন্দারা। উত্তোলন করা হয় জাতীয় পতাকা। উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি গ্রামের প্রবীণদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন তরুণেরা। দিনভর চলে আনন্দ আয়োজন।
খোরশেদ আলম জানান, পাশের আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। সেটি সম্ভব হলে মোট ১২০ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলা যাবে একটি মানসম্মত খেলার মাঠ। মাঠটিকে ঘিরে গ্রামের খেলাধুলার পরিবেশ উন্নত করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
মাঠের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা পাওয়ার আশায় খুশি গ্রামের কিশোরেরাও। হাবিবুল্লাহ সালমান জানায়, ধান কাটার পর ফাঁকা জমিতে খেলাধুলা করা গেলেও ফসলের আবাদ শুরু হলে আর জায়গা পাওয়া যেত না। এখন সারা বছর খেলার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তারা আনন্দিত।

আরেক কিশোর রাব্বী জোহা জানায়, বাড়ির উঠানে ফুটবল খেলতে গিয়ে বলের আঘাতে অনেক সময় ঘরের বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এ জন্য পরিবারের সদস্যদের বকাঝকাও শুনতে হতো। মাঠ হওয়ায় এখন নিশ্চিন্তে খেলতে পারবে তারা।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল একটি খেলার মাঠ। নিজেদের উদ্যোগে সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় গ্রামের সবাই আনন্দিত।
বাবুপুর মসজিদ কমিটির সভাপতি নজরুল শিকদার মনে করেন, নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ কিশোর-তরুণদের সুস্থ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে তাদের মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতেও ভূমিকা রাখবে।
বাবুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমির পরিচালক মোনালিসা মুন্নি বলেন, গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল একটি মাঠ। সবাই মিলে তা বাস্তবায়ন করতে পারা বড় অর্জন।
সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা এ উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, বাবুপুরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দেশের অন্য গ্রামের বাসিন্দাদেরও নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে।

আরও ৬০ শতক কিনে দেবেন প্রতিমন্ত্রী
গ্রামবাসীর এই উদ্যোগের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমর্থন জানিয়ে ওই মাঠের পাশেই আরও ৬০ শতাংশ জমি সরকারিভাবে কিনে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। আগামী রোববার (১ নভেম্বর) জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে দেলদুয়ারের জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং বাবুপুর গ্রামের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। সেখানে এই সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হবে এবং গ্রামবাসীকে সংবর্ধিত করা হবে।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, ‘খেলার মাঠের জন্য বাবুপুর গ্রামের মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ ক্রীড়াঙ্গনে এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকার ও মন্ত্রণালয় সবসময় এমন ইতিবাচক ও স্ব-উদ্যোগী কাজকে উৎসাহ দিতে চায়। শিশু-কিশোরদের খেলার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা যদি এই গ্রামবাসীর পাশে থাকতে পারি, তা হবে বিশেষ কিছু।’ তিনি আরও বলেন, এটি কেবল একটি মাঠ তৈরি নয়, বরং সারা দেশের জন্য জনসম্পৃক্ততার এক দারুণ অনুপ্রেরণামূলক মডেল।