কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) প্রযুক্তি-কূটনীতি ও সরকারি সেবার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। আগামী ১২ মাসের মধ্যে নিজস্ব সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার। এ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং চিপ ও মেমোরি সংগ্রহ নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। সরকারের লক্ষ্য, বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং সরকারি সেবা থেকে শুরু করে গবেষণা ও ব্যবসায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানো।
এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিলনায়তনে ‘এআই ও উদ্ভাবন সংলাপ’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। আয়োজকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের প্রযুক্তি-কূটনীতি ও জনসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াতে নীতিগত সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ খুঁজতেই এ আয়োজন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, জনগণের কাছে উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কম্পিউটিং সুবিধা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। আগামী ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং চিপ ও মেমোরি সংগ্রহের ব্যবস্থা ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চগতির ও নিরাপদ সংযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সার্বভৌম এআই বলতে এমন সক্ষমতাকে বোঝায়, যেখানে একটি দেশ নিজস্ব অবকাঠামো, তথ্য, দক্ষ জনবল ও কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি ও পরিচালনা করতে পারে। এর অর্থ সব প্রযুক্তি দেশেই তৈরি করা নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর দেশের নিয়ন্ত্রণ এবং নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতা অর্জন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ও গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, এআইয়ের সুফল কাজে লাগাতে সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারি সেবার বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও আন্তঃকার্যক্ষমতা নিশ্চিত করাও জরুরি। তাঁর মতে, বিচ্ছিন্নভাবে প্রযুক্তি চালু না করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং সেবার বিভিন্ন স্তরে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ইসমাইল জবিউল্লাহ দেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি নীতি প্রণয়নে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের কথাও স্মরণ করেন। বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির বলেন, তৈরি পোশাক খাত ও প্রবাসী আয় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই ভিত্তি। তবে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে জ্ঞানভিত্তিক কর্মী তৈরির মাধ্যমে নতুন একটি অর্থনৈতিক স্তম্ভ গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে দক্ষ জনবল তৈরি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অর্থ বাংলাদেশ একা চলবে—এমন নয়; বরং বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত। এআইয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন উদ্যোগে সহায়তা, স্টার্টআপের বিকাশ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে। সম্প্রতি সিলিকন ভ্যালি সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি ঢাকা ও বিশ্বের প্রযুক্তি-উদ্ভাবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সক্ষমতার ব্যবধান কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু বিদেশ থেকে প্রযুক্তি কিনে ব্যবহার করা নয়; ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী সেবা সরবরাহেও সক্ষম হয়ে ওঠা। তবে এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যবসার নতুন সুযোগ তৈরির জন্য ব্যবহার করা উচিত। প্রযুক্তির অপব্যবহার, বিশেষ করে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতায় এর ব্যবহার ঠেকানোও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে বলে জানান তিনি।
সংলাপের উদ্বোধনী বক্তব্যে পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেন, এআই নিয়ে বিশ্বে এখন মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে—এ প্রযুক্তি কে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং এর সুফল কারা পাবে। বাংলাদেশ শুধু এআইয়ের ভোক্তা হয়ে থাকতে চায় না; বরং এর সুফলের ন্যায্য অংশীদার হতে চায়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতেও বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘের এআই শাসনব্যবস্থাবিষয়ক বৈশ্বিক সংলাপে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত সমন্বয় করবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এআইয়ের আন্তর্জাতিক নীতিমালা, নিরাপত্তা, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার ও সুফল বণ্টনের মতো বিষয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংলাপে ঢাকায় একটি এআই নীতিমালা গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কারিগরি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি শাখা এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এ বিষয়ে প্রস্তাব তুলে ধরে। অনুষ্ঠানে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. মাহফুজুর রহমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে এআইয়ের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট দিকগুলো আলোচনা করেন।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, সংলাপে ২৫টি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিদেশে বাংলাদেশের ৮৫টি কূটনৈতিক মিশন অনলাইনে যুক্ত ছিল। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, কূটনৈতিক প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরাও অংশ নেন।
তবে নিজস্ব এআই অবকাঠামো চালুর ঘোষণা বাস্তবায়নে কম্পিউটিং সক্ষমতা, তথ্যের নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির সংযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। আগামী এক বছরে ঘোষিত অবকাঠামো কতটা কার্যকরভাবে চালু হয় এবং তা গবেষণা, ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের কাজে কীভাবে যুক্ত হয়, সেটিই হবে উদ্যোগটির অগ্রগতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।