তফসিল ঘোষণা না হলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে দুই সিটিতে নিজেদের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে বড় দল বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। দলটির একাধিক নেতা দুই সিটিতে মনোনয়ন পেতে তৎপর রয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপি তাদের প্রার্থী তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা দক্ষিণে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এ সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে গত ৭ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদ উত্তর সিটি ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দক্ষিণ সিটির ভোটার হন। দলীয় সূত্র বলছে, অভ্যন্তরীণ জরিপ ও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এনসিপি জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা জামায়াতে ইসলামীসহ কোনো দলের সঙ্গে জোটগতভাবে প্রার্থী দেবে না। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে দলটি এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে একই রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে ঐক্য থাকলেও ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীদের আলাদা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যেতে পারে।
জামায়াতও ঢাকার দুই সিটিতে নিজেদের প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করেছে। ঢাকা উত্তরে দলটির প্রার্থী মহানগর আমির সেলিম উদ্দিন। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। আর ঢাকা দক্ষিণে দলটির প্রার্থী হিসেবে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমের নাম চূড়ান্ত হয়েছে। দলীয় সূত্রের ভাষ্য, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পরে দেওয়া হলেও দুই সিটিতে তাঁদের প্রার্থিতা কার্যত চূড়ান্ত।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই সিটির জন্য মহানগর পর্যায় থেকে সেলিম উদ্দিন ও সাদিক কায়েমকে বাছাই করা হয়েছে। তাঁদের দুজনকেই জনপ্রিয় এবং ছাত্র নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা নেতা হিসেবে বিবেচনা করছে দলটি।
এদিকে বিএনপির ভেতরে চলছে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ। দলীয় সূত্র বলছে, একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় তফসিল ঘোষণার আগে প্রার্থী প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে চাইছে না দলটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানও বলেছেন, ঢাকায় এখন পর্যন্ত কোনো মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে দলীয় হাইকমান্ড খোঁজখবর নিচ্ছে এবং তফসিল ঘোষণার পর প্রার্থী ঘোষণা করা হতে পারে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় রয়েছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বর্তমান দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালাম এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
হাবিব উন নবী খান সোহেল দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতা হিসেবে বিএনপির ভেতরে পরিচিত। দলীয় নেতাদের একাংশ মনে করেন, মাঠের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক ভূমিকা মেয়র প্রার্থী বাছাইয়ে বিবেচনায় আসতে পারে।
অন্যদিকে বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালামও আলোচনায় রয়েছেন। সম্প্রতি মেয়র পদে নির্বাচন করার আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, নগরবাসীর সহযোগিতা পেলে ঢাকাকে আরও পরিচিত ও গর্বের শহরে পরিণত করতে চান।
ইশরাক হোসেনের নামও দক্ষিণে জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। তবে তাঁর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৬ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন। ফলে জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁকে সিটি নির্বাচনে প্রার্থী করা হবে কি না, সেটিও দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। ঢাকা-৬ আসনে তিনি জামায়াতের প্রার্থী মো. আবদুল মান্নানকে ২৩ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুম এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
তাবিথ আউয়ালের সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর পরিচিতি এবং নগর রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সক্রিয়তার কারণে এবারও তাঁর নাম আলোচনায় রয়েছে।
এম এ কাইয়ুমও দীর্ঘদিনের মাঠের নেতা হিসেবে বিএনপিতে পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে তিনি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পরাজিত হন। তবে তৃণমূল পর্যায়ে তাঁর সাংগঠনিক অবস্থানকে দলের একটি অংশ গুরুত্ব দিচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের কাছে পরাজিত হন। সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যে তিনি মাঠে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হিসাব হতে পারে জামায়াত ও এনসিপির আলাদা প্রার্থিতা। উত্তরে একদিকে জামায়াতের সেলিম উদ্দিন, অন্যদিকে এনসিপির আসিফ মাহমুদ—দুজনই তুলনামূলকভাবে তরুণ প্রজন্মের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। দক্ষিণেও জামায়াতের সাদিক কায়েম ও এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর পাশাপাশি বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীকে মাঠে নামতে হবে।
বিশেষ করে এনসিপির প্রার্থী বদলকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। আগে ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ ও উত্তরে আরিফুল ইসলাম আদীবকে প্রার্থী করার কথা জানিয়েছিল এনসিপি। পরে দলীয় জরিপ ও মাঠের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় আসিফকে উত্তরে এবং নাসীরুদ্দীনকে দক্ষিণে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এনসিপির নেতারা অবশ্য বলেছেন, অন্য কোনো দলের প্রার্থী বা রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ জরিপের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফলে তফসিল ঘোষণার আগেই ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনকে ঘিরে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি কাঠামো স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। জামায়াত ও এনসিপি নিজেদের প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর বিএনপি এখনো সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থী কারা হন এবং জামায়াত-এনসিপির আলাদা লড়াই ভোটের হিসাবকে কীভাবে প্রভাবিত করে—নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সেটিই ঢাকার রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ হয়ে উঠতে পারে।