সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় আশপাশের কয়েকজন সংসদ সদস্য তাঁকে ‘অকথ্য ভাষায়’ গালাগালি করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেছেন, এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না। সংসদে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল নিয়ে আলোচনার সময় বৃহস্পতিবার তিনি এ অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে হট্টগোল তৈরি হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। স্পিকার বলেন, সংসদে সবাই বাক্স্বাধীনতার পক্ষে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রত্যেক সংসদ সদস্য যেন বক্তব্য দেওয়ার সময় অন্য পক্ষ বা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে কোনো ধরনের বাধার মুখে না পড়েন, সেটিই তিনি আশা করেন।
এরপর স্পিকার রুমিন ফারহানাকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিলটি জনমত যাচাই এবং বাছাই কমিটিতে পাঠানোর বিষয়ে বক্তব্য দিতে অনুরোধ করেন। রুমিন ফারহানা বলেন, সংসদে সরকারি দল থাকবে, বিরোধী দল থাকবে এবং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও থাকবেন। প্রত্যেকের মতামত এক রকম হবে না। তাই সংসদে নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবার থাকা উচিত। তিনি বলেন, ‘একেকজনের একেক রকম মত থাকতে পারে, সেটি প্রকাশ করার স্বাধীনতা প্রত্যেকের থাকা উচিত।’ রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ২০১৮ সালের সংসদেও তিনি বিএনপির পক্ষে একা দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলেন। সে সময়ও তাঁকে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের সংসদে যখন একা দাঁড়িয়ে বিএনপির পক্ষে কথা বলেছিলাম, তখনও আমাকে এই জঘন্য পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।’
এরপরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, কয়েক হাজার মানুষের প্রাণের বিনিময়ে দেশে ভোটের মাধ্যমে বর্তমান সংসদ এসেছে। তাই আগের সংসদগুলোর মতো একই পরিস্থিতি আবার তৈরি হলে তার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তিনি বলেন, ‘এরপর কয়েক হাজার মানুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা ভোটের মাধ্যমে সংসদ আনলাম। সেখানে যদি ন্যূনতম কোনো পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে এই সংসদে বিরোধীদল সেজে শুধু না’তে ভোট দেওয়ার জন্য থাকার কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।’
এপিবিএন বিল নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে রুমিন ফারহানা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, অতীতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ধরনের আচরণ মানুষ দেখেছে। বিভিন্ন সময় মানুষকে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ভবিষ্যতে কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার এমন আচরণ দেখতে চান না বলে জানান এই সংসদ সদস্য। রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বিগত দিনে আমরা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে ধরনের আচরণ দেখেছি, নানানভাবে মানুষকে হেনস্তা হতে দেখেছি, নির্যাতিত হতে দেখেছি, ভবিষ্যতে আমরা কোনো সংস্থার এমন আচরণ চাই না।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করেছে। সংসদে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো যেন নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে দলীয়করণমুক্ত হয়ে এবং প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজেদের কাজ পরিচালনা করতে পারে।’
এদিকে সংসদে তাঁর বক্তব্যের সময় গালাগালির অভিযোগ ওঠার পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। স্পিকার সরকারি ও বিরোধী—উভয় পক্ষের সংসদ সদস্যদের সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রেখে একে অপরের বক্তব্য শোনার আহ্বান জানান।
সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্যের অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে রুমিন ফারহানার বক্তব্যের মধ্যেই এ ঘটনা ঘটে। একই অধিবেশনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামো ও ক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আইন নিয়েও আলোচনা হয়েছে।