‘যে জিন্নাহ আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, সে জিন্নাহকে কীভাবে এখানে রাখে?’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে সেগুলো ছিঁড়ে ফেলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে সংগ্রহশালায় গিয়ে ছবিগুলো ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান উর্দু বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। এ সময় তিনি ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের কারণ জানতে চান। তাঁর বক্তব্য, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যথাযথভাবে উপস্থাপন না করে জিন্নাহর ছবি সংগ্রহশালায় রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
আবু তৈয়ব বলেন, “এ দেশের ভাষা আন্দোলনের আসল নায়কদের বাদ দিয়ে পাকিস্তানের জাঁদরেল জিন্নাহর ছবি কেন ডাকসু রেখেছে, তার জন্য প্রশাসন ও ডাকসুর নেতাদের জবাব দিতে হবে। যে জিন্নাহ আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, সে জিন্নাহকে কীভাবে এখানে রাখে?” তিনি বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—সব জায়গায় রক্ত দিয়েছে। এখানে থাকতে হবে ভাষা আন্দোলনের নায়ক আবুল কাসেমের ছবি। এখানে থাকবে শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ।”
আবু তৈয়ব ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিন ছবি
সংস্কার শেষে রোববার ডাকসু সংগ্রহশালা পুনরায় চালু করা হয়। নতুন করে সাজানো সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের ছবি, সংবাদপত্রের কাটিং ও ঐতিহাসিক নিদর্শন রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি বিশেষভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে। একটি ছবিতে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার দৃশ্য রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ওই বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচিত। ওই সময় জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। আরেকটি ছবি ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি গ্রুপ ছবি। এতে জিন্নাহসহ মুসলিম লীগের তৎকালীন নেতাদের দেখা যায়। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পেপার কাটিং, যেখানে জিন্নাহর ছবিও রয়েছে।

সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে রোববার থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর এক দিন পরই সরাসরি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানালেন আবু তৈয়ব।
ছাত্রদলের প্রতিবাদ
জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও। সোমবার সকালে সংগঠনটি এক বিবৃতিতে ডাকসুর বর্তমান পরিষদের বিরুদ্ধে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তোলে। ছাত্রদল বলেছে, “শিবির নিয়ন্ত্রিত ডাকসুর এই পরিষদ শিক্ষার্থীদের গণআকাঙ্ক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিকামী চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রতি তাদের প্রচ্ছন্ন অনুরাগ ও ‘পাকিস্তান প্রেম’ জাহির করছে।” সংগঠনটি আরও দাবি করে, ডাকসুর সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও ঘটনাগুলো উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যথাযথভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেয় তারা।
তবে জিন্নাহর ছবি সংগ্রহশালায় রাখার পক্ষে ডাকসুর পক্ষ থেকে যে ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহকে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরার যুক্তি সামনে এসেছে। ফলে জিন্নাহর ছবি রাখা ইতিহাস উপস্থাপনের অংশ, নাকি এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে—এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ইতিহাস উপস্থাপন নিয়ে নতুন বিতর্ক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাস নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোরও দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে সেখানে কোন ব্যক্তি বা ঘটনা কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে, তা নিয়ে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের আগ্রহ ও প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও প্রকাশ্য করেছে। একদিকে ঐতিহাসিক ঘটনার দলিল হিসেবে জিন্নাহর ছবি রাখার যুক্তি রয়েছে; অন্যদিকে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় তাঁকে এভাবে প্রদর্শনের বিরোধিতা করছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
তবে ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় সংগ্রহশালার সম্পদ ও ঐতিহাসিক উপকরণ সংরক্ষণের প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহশালায় কোনো ঐতিহাসিক উপকরণ প্রদর্শন নিয়ে মতবিরোধ থাকলে তা ভাঙচুর বা ক্ষতিসাধনের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কের মাধ্যমে সমাধানের দাবি উঠেছে।
জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় প্রশাসনিকভাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।