রাজনীতি

নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা: পুরোনো দ্বন্দ্ব কি নতুন রূপে ফিরে আসছে?

নাঈম-উল করীম
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০
 ছবি:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। প্রায় দুই দশক পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন, জামায়াতে ইসলামীর প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উত্থান এবং জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ—সব মিলিয়ে ধারণা তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতি এবার হয়তো পুরোনো দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার চক্র থেকে বেরিয়ে নতুন পথে হাঁটবে। কিন্তু নির্বাচনের প্রায় আট মাস পর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, বিরোধীদের সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন, দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দখল ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার এবং জুলাই অভ্যুত্থানের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, সরকার বদলালেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কতটা পরিবর্তন হয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। তাদের পর্যবেক্ষণে নির্বাচনটি বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, ভয়ভীতি, অনলাইন অপতথ্য এবং নারী প্রার্থীদের হয়রানির ঘটনা ছিল। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ২৭ জেলায় অন্তত ৫৬টি শারীরিক সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২০০ জন হতাহত হওয়ার তথ্যও দিয়েছে সংস্থাটি। অর্থাৎ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আগের তুলনায় বেড়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক আচরণের পুরোনো সমস্যাগুলো পুরোপুরি দূর হয়নি।

নির্বাচনের পরের চিত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা যায়। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় বিএনপি ও তাদের মিত্রদের সম্পৃক্ততার হার যথাক্রমে ৫২, ৫৩ ও ৭৫ শতাংশ। জামায়াত ও তাদের মিত্রদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল যথাক্রমে ১৫, ১৩ ও ৯ শতাংশ। এসব তথ্যের অর্থ এই নয় যে কোনো দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরাসরি সহিংসতার নির্দেশ দিয়েছে। তবে ক্ষমতার পালাবদলের পর মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক সংঘাতের ধরন কতটা বদলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার পর ক্ষমতায় এসে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের রাজনৈতিক আচরণে পরিবর্তন আনা। দলটি নির্বাচনের আগে আইনের শাসন, মানবাধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নির্বাচনের আগে Innovision-এর People's Election Pulse Survey-তে ১০ হাজার ৪১৩ জনের মধ্যে ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধিকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। অর্থাৎ বিএনপির প্রতি ভোটারদের প্রত্যাশার বড় অংশই ছিল নিরাপত্তা ও সুশাসনকেন্দ্রিক।

ক্ষমতায় আসার পর দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষা তৈরি করেছে। ঢাকার মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। পরে সংশ্লিষ্ট এক সংসদ সদস্যকে সরিয়ে দেওয়া হয়। রাজধানীর ECB চত্বরের কাছে একটি ভবন ও একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাতেও বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম আসে। দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা সরকারের জন্য একদিকে জবাবদিহির বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে, অন্যদিকে প্রশ্ন উঠেছে—এগুলো কি প্রকৃত রাজনৈতিক সংস্কারের লক্ষণ, নাকি ঘটনা প্রকাশের পর রাজনৈতিক ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা?

এ বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে রাজনৈতিক সমাবেশ থেকে আটকের ঘটনায়। ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের একটি সভা থেকে প্রায় ২৯০ জনকে আটক করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, সেটি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গোপন সভা। পরে ২৭ জনকে আদালতের মাধ্যমে হেফাজতে পাঠানো হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার বিষয়টিও ছিল। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনাকে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটির এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন বিএনপি সরকারের একই ধরনের অধিকার খর্ব করার যুক্তি হতে পারে না।

এই বক্তব্য বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ। নতুন সরকার যদি একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে, তবে শুধু সরকার পরিবর্তনকে রাজনৈতিক পরিবর্তন বলা কতটা যুক্তিযুক্ত—সেই প্রশ্নই সামনে আসে। অবশ্য আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক দমন-পীড়নের সঙ্গে বর্তমানের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে মাত্রাগতভাবে এক করে দেখা যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষার নীতিগত প্রশ্নটি থেকেই যায়।

বিরোধী রাজনীতিতেও পরিবর্তনের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। ২০২৬ সালের সংসদে বিএনপির বিপরীতে প্রধান শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা এনসিপি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু নির্বাচনের কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে শুরু করেছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন তার অন্যতম বড় উদাহরণ।

সরকার সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কার করতে চায়। বিরোধী দলগুলো সেই কমিটির পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে অংশগ্রহণ করেনি এবং সংসদ থেকে ওয়াকআউটও করেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিরোধীদের সংসদের বাইরে রাজপথে আন্দোলনের সমালোচনা করে বলেছেন, নির্বাচনের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে রাজপথের কর্মসূচি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দাবি আদায়ের প্রধান জায়গা হওয়া উচিত সংসদ।

বিরোধীদের যুক্তি অবশ্য ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু নির্ধারণ করলে ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল শিক্ষা ব্যর্থ হবে। তাদের মতে, জুলাই সনদ কেবল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; এটি রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন নিয়ে জনগণের একটি রাজনৈতিক ম্যান্ডেট। ফলে সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত নিলে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা আবার পুরোনো সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতিতে ফিরে যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানী অধ্যাপক আলী রিয়াজের বিশ্লেষণ এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, একটি নির্বাচন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মাত্র একটি ধাপ। প্রকৃত পরিবর্তন নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ ও প্রশাসন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো—নির্বাচন ভালো হলেই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ভালো হয়ে যায় না। বাংলাদেশের অতীতের রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছে কারণ সরকার বদলালেও ক্ষমতার কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে গেছে।

The Daily Star-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনামও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্ব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের অতীতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতার নজির থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল হচ্ছে। তাঁর বিশ্লেষণে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মতো মৌলিক বিষয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। না হলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা আবার অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, আওয়ামী লীগের পতনের একটি বড় শিক্ষা যদি হয় যে ক্ষমতাসীন দলের ওপর কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, তাহলে বিএনপি সরকার সেই একই ধরনের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান তৈরিতে কতটা প্রস্তুত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক তারিক মনজুরের পর্যবেক্ষণও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, জুলাই আন্দোলনের পর জনগণের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি। আন্দোলনের সমন্বয়কদের একটি অংশও জনগণের প্রত্যাশা পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি এবং তাদের কিছু কর্মকাণ্ড জনআস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অর্থাৎ নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা শুধু পুরোনো দলগুলোর আচরণ পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে না; জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অসম্পূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জার্মানির GIGA Institute-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণের শিরোনামই ছিল ‘Revolution Incomplete: Old Guards in Bangladesh’s New Political Order’। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হলেও পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো নতুন ব্যবস্থার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, জামায়াত বড় বিরোধী শক্তি হয়েছে এবং এনসিপি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু পুরোনো রাজনৈতিক অর্থনীতি ও ক্ষমতার কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে যায়নি।

Carnegie Endowment-এর বিশ্লেষক Avinash Paliwal-ও ২০২৬ সালের নির্বাচনকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অগ্রগতি হিসেবে দেখেছেন। তবে তাঁর বিশ্লেষণে বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকতার প্রশ্নও এসেছে। অর্থাৎ নির্বাচন বদলেছে, ক্ষমতাসীন দল বদলেছে, সংসদের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলেছে; কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহারের পুরোনো ধরন কতটা বদলেছে, সেটি এখনও পরীক্ষাধীন।

এই প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি এসেছে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের কাছ থেকে। আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং বর্তমানে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, আন্দোলনের লক্ষ্য শুধু একজন সরকারপ্রধানকে সরানো ছিল না; রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। তাঁর অভিযোগ, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনও পুরোপুরি হয়নি।

সাবেক আন্দোলন সমন্বয়ক রিফাত রশিদও বলেছেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, সেটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আরেক সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদেরের বক্তব্য, তাঁদের লক্ষ্য শুধু একজন নেতাকে ক্ষমতা থেকে সরানো ছিল না; যে রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে কর্তৃত্ববাদ তৈরি হয়, সেটিই পরিবর্তন করা ছিল উদ্দেশ্য।

সাধারণ মানুষের কাছেও ‘নতুন রাজনীতি’র অর্থ অনেক বেশি বাস্তব ও সরল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রেজওয়ান আহমেদ রিফাত মনে করেন, গণতান্ত্রিক পরিসর কিছুটা ফিরেছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও অতীতের নিপীড়নের জবাবদিহি এখনো অসম্পূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষার্থী মাহিন মনোয়ারের হতাশা আরও সরাসরি—একটি দল ক্ষমতা থেকে গেছে, আরেকটি দল ক্ষমতায় এসেছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়।

এই বক্তব্যগুলোকে শুধু রাজনৈতিক বিরোধীদের অভিযোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ ২০২৪ সালের আন্দোলনের একটি বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বদলের প্রত্যাশা। তাদের কাছে রাজনৈতিক পরিবর্তনের অর্থ ছিল না কেবল নতুন প্রধানমন্ত্রী বা নতুন মন্ত্রিসভা। তারা চেয়েছিল এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে পুলিশ রাজনৈতিক নির্দেশে কাজ করবে না, বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে, ভিন্নমত প্রকাশের জন্য মানুষকে ভয় পেতে হবে না এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত থাকবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তাই বিএনপি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি। নির্বাচনের আগে ভোটারদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের তালিকায় আইনশৃঙ্খলা ছিল শীর্ষে। কিন্তু নির্বাচনের পরও রাজনৈতিক সহিংসতা ও জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মানবাধিকার সংগঠন Manabadhikar Shongskriti Foundation-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় সাতজন নিহত ও ৯৫ জন আহত হন। একই মাসে ৬৬টি গণপিটুনির ঘটনায় ৩১ জন নিহত ও ৫৮ জন আহত হন।

এখানে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কি কেবল অপরাধ দমনের বিষয়, নাকি রাজনৈতিক সংস্কারেরও অংশ? যদি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর দলীয় শাস্তিই প্রধান ব্যবস্থা হয়, কিন্তু নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার না হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারবে না। রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রকৃত পরীক্ষা হবে অভিযোগ ওঠার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন দলের, কোন পদে আছেন বা কতটা ক্ষমতাবান—এসব বিবেচনা না করে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারে কি না।

বিএনপি অবশ্য দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ তখনই কার্যকর হবে যখন দলীয় শাস্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আইনও নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হবে। অন্যথায় দলীয় ‘শুদ্ধি অভিযান’ রাজনৈতিক ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার আরেকটি বড় প্রশ্ন আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও। ২০২৬ সালের নির্বাচন ছিল প্রতিযোগিতামূলক, কিন্তু আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। Carnegie-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হলেও পুরোপুরি inclusive ছিল না, কারণ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে নির্বাচনের বাইরে ছিল। একই সঙ্গে দলটির ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাতের একটি বড় সম্ভাব্য উৎস হতে পারে।

এখানেও ভারসাম্যের প্রশ্নটি অত্যন্ত কঠিন। একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিচার ও জবাবদিহি প্রয়োজন। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নও রয়েছে। কোনো দলের অতীত অপরাধের বিচার এবং সেই দলের সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকার—দুটি বিষয়কে একই করে দেখলে ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বাংলাদেশকে ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪ সালের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যাবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচন ছিল ২০০৮ সালের পর প্রথম সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মৌলিক স্বাধীনতাগুলো মোটামুটি সম্মানিত হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ আগের জায়গায় পুরোপুরি ফিরে যায়নি।

তবে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব এখনো নিশ্চিত নয়। রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় কর্মীদের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, বিরোধীদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন—এসব প্রশ্নের উত্তর আগামী কয়েক বছরেই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন আসলে কতটা গভীর হয়েছে।

সম্ভাব্য একটি পথ হলো, বিএনপি সরকার জুলাই সনদের মূল সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে, বিরোধী দলের মতামত গ্রহণ করবে এবং নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও প্রশাসনকে কার্যকরভাবে স্বাধীন করবে। এতে ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

আরেকটি পথ হলো নির্বাচনী গণতন্ত্র বজায় থাকবে, সংসদ থাকবে, বিরোধী দলও থাকবে, কিন্তু প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বাড়বে। এতে সরকার বদলালেও পুরোনো রাজনৈতিক মডেল নতুন দলের হাতে ফিরে আসবে।

তৃতীয় সম্ভাবনা হলো নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ। বিএনপি বনাম জামায়াত-নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সংঘাত বাড়তে পারে, এনসিপি আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজপথের আন্দোলন তীব্র হতে পারে। এমন পরিস্থিতি হলে রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি অর্থনীতি ও বিনিয়োগেও চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে তাই এখন প্রশ্নটি আর শুধু ‘কে ক্ষমতায়?’ নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, রাষ্ট্র কি এবার আগের মতো থাকবে?

২০২৪ সালের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—কোনো সরকারই জনগণের ওপর সীমাহীন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না। ২০২৬ সালের নির্বাচন সেই শিক্ষার ভিত্তিতে একটি নতুন সরকার তৈরি করেছে। কিন্তু এখন দ্বিতীয় পরীক্ষা শুরু হয়েছে। বিএনপি কি নিজের জন্যও ক্ষমতার সীমা মেনে নেবে? বিরোধী দল কি সংসদীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে, নাকি পুরোনো রাজপথের সংঘাতে ফিরে যাবে? জামায়াত ও এনসিপি কি কেবল বিএনপিবিরোধী শক্তি হিসেবে থাকবে, নাকি বিকল্প নীতির রাজনীতি তৈরি করতে পারবে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—২০২৪ সালের মানুষ কি শুধু সরকার পরিবর্তন চেয়েছিল, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিই পরিবর্তন চেয়েছিল?

জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য, দেশি-বিদেশি বিশ্লেষণ এবং বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের দিকে তাকালে দ্বিতীয় উত্তরটিই বেশি শক্তিশালী বলে মনে হয়। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আসল পরীক্ষা নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে শেষ হয়নি; বরং নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতার আচরণেই তার প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়েছে।

সরকার বদলেছে। সংসদের চরিত্র বদলেছে। বিরোধী রাজনীতির মানচিত্র বদলেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহৃত হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে একটি বিষয়ের ওপরই—ক্ষমতায় থাকা দলটি কতটা শক্তিশালী, তার চেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাসীন দলের ঊর্ধ্বে কতটা শক্তিশালী হতে পারে।

১

লালমনিরহাটে পারিবারিক জমি বিরোধে বিএনপি নেতাদের জড়িয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ

২

বিএনপির সঙ্গে যুক্ত থাকায় অনেককে জুলাই যোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় : প্রতিমন্ত্রী ইশরাক

৩

দিল্লির যন্তরমন্তরের আশপাশে ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ ইন্টারনেট

৪

হু ইজ হাদি?- টকশোতে ভিপি নুরের মন্তব্য, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড়

৫

মেট্রোরেলের পিলারে খালেদা জিয়াসহ থাকছে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি

৬

বায়তুল মোকাররমের খতিবের অপপ্রচারের অভিযোগে বিএনপির যুগপতের সঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের বিক্ষোভ

৭

জামালপুরের মেলান্দহে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে ইমাম উধাও, থানায় অভিযোগ

৮

মৌলবাদ মোকাবিলায় সংস্কৃতিকে কাজে লাগাতে হবে : সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

৯

হাদির লড়াই জিয়াউর রহমানের চেয়েও শক্তিশালী: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

১০

বিএনপি সরকারের সাত মাসে ৩২ কূপ খনন, যুক্ত হচ্ছে প্রায় ১৪৮ এমএমসিএফ গ্যাস

১১

শান্তিতে নোবেল পেলেন মানবাধিকার কর্মী নাভেনথাম নাভি পিলাই

১২

হাসিনার কবরটাও দেয়ার মতো সাহস বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কারো নেই: রাশেদ খাঁন

১৩

স্থানীয় নির্বাচনে ধোঁকাবাজ-চাঁদাবাজদের বর্জন করতে হবে: চরমোনাই পীর

১৪

উন্নীত স্কেলের জটিলতায় উচ্চতর গ্রেড থেকে বঞ্চিত প্রাথমিকের শিক্ষকরা

১৫

চট্টগ্রামে দেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক উদ্বোধন, আরও ট্র্যাক নির্মাণের আশ্বাস অর্থমন্ত্রীর

১

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

২

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

৩

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

৪

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

৫

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

৬

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

৭

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

৮

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

৯

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত