রংপুর নগরীকে যানজটমুক্ত করতে এবং ফুটপাত ও সড়ক থেকে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে অভিযানের সুফল স্থায়ী হচ্ছে না। উচ্ছেদের দু-এক দিনের মধ্যেই আবারও আগের অবস্থায় ফিরে আসছে ফুটপাত ও সড়ক। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী।
অভিযোগ রয়েছে, নগরীর বিভিন্ন ফুটপাত ভাসমান দোকানদারদের দখলে চলে গেছে। এসব দোকান বসানোর বিনিময়ে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা বা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অনেক স্থায়ী দোকান মালিকও নিজেদের দোকানের সামনের ফুটপাতে ভাসমান দোকান বসিয়ে দৈনিক ভাড়া আদায় করছেন।
শুধু দোকান বসানোতেই থেমে নেই দখলদারিত্ব। ভাসমান দোকানগুলোতে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাতে ঘর, দেয়াল ও গাছের সঙ্গে মিটার বক্স ঝুলিয়ে এসব সংযোগ দেওয়া হয়েছে। একটি বা দুটি মিটার থেকে শতাধিক সাবলাইন টেনে দোকানগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বিদ্যুতের অপচয়ের পাশাপাশি মিটার টেম্পারিং করে বিদ্যুৎ বিভাগকে ফাঁকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এ ধরনের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও এ বিষয়ে কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নগরীর স্টেশন রোড, জাহাজ কোম্পানি মোড়, সিটি বাজার, ধাপ, লালবাগ, শাপলা চত্বর, মেডিকেল মোড়, জিলা স্কুল মোড়, টাউন হল-সংলগ্ন জুলাই স্মৃতিসৌধ চত্বর, লালকুটি মোড়, খামার মেয়রের মোড় ও নেসকো অফিস মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ফুটপাত এখন দখল হয়ে আছে।
ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে কাপড়, ফল, সবজি, খাবার ও জুতা-স্যান্ডেলের দোকান বসেছে। কোথাও কোথাও গড়ে উঠেছে স্থায়ী অবকাঠামোও। ফলে ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়কে নেমে চলাচল করছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে অফিস-আদালত ও স্কুল-কলেজ ছুটির সময়ে পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। নারী, শিশু ও বয়স্কদের পড়তে হয় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার যানজট। শাপলা চত্বর এলাকার আমজাদ হোসেন বলেন, ফুটপাত দিয়ে পথচারীদের চলাচলের কোনো উপায় নেই। সড়কের দুই পাশে ভাসমান ফল, সবজি, কাপড় ও জুতা-স্যান্ডেলের দোকান বসেছে। অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যস্ত সড়কগুলোতে যানজট ও বিশৃঙ্খলা বাড়ছে।
পায়রা চত্বর এলাকার হাসনাইন আহমেদ ও দেওয়ানবাড়ী রোডের মেহেদী হাসানসহ স্থানীয় কয়েকজন জানান, জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে বেতপট্টি, লোহাপট্টি, সোনাপট্টি, হাড়িপট্টি ও দেওয়ানবাড়ী রোড পর্যন্ত হেঁটে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। রাস্তার ওপর ভাসমান দোকান, গাড়ি পার্কিং ও ছোট ছোট অসংখ্য দোকান রয়েছে। অনেকেই রাস্তা দখল করে ব্যবসা করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেউ কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সড়কের ওপর দোকানঘর তুলে ব্যবসা করছেন। এসব বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি নেই বলেও অভিযোগ তাঁদের।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। হকারদের সরিয়ে দেওয়া এবং মালপত্র জব্দ করা হলেও এসব উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। অভিযানের পরদিনই আবার ফুটপাত ও সড়কে ফিরে আসছেন হকাররা। ফলে উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের ঘটনা যেন নিয়মিত চক্রে পরিণত হয়েছে।
মুলাটোল এলাকার ইকবাল সুমন বলেন, রংপুর শহরে বর্তমানে মানুষের চেয়ে অটোরিকশার সংখ্যা বেশি মনে হয়। যানজটের কারণে ১০ মিনিটের পথ যেতে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে। কর্মজীবীদের কর্মস্থলে পৌঁছাতেও স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
গণমাধ্যমকর্মী সাজ্জাদ আলী তুষার বলেন, নগরবাসীর ভোগান্তির সঙ্গে এখন রাস্তা দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাটও যুক্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি সড়কে এলোমেলোভাবে গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে। এতে যানজট আরও তীব্র হচ্ছে। সিটি করপোরেশন ভবন এলাকা থেকে জাহাজ কোম্পানি মোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের দখলচিত্র সহজেই চোখে পড়ে।
তিনি জানান, রংপুর মহানগরে ৬০ হাজারের বেশি অটোরিকশা চলাচল করলেও অনুমোদিত অটোরিকশার সংখ্যা মাত্র সাড়ে আট হাজার। এর সঙ্গে সড়ক দখল করে কয়েকশ দোকান গড়ে ওঠায় পথচারীদের চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, রংপুরের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ কেনাকাটা ও বিভিন্ন কাজে নগরীতে আসেন। কিন্তু যানজট ও ফুটপাত দখলের কারণে তাঁদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন-নবী ডন বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তবতা হলো, অনেক হকার জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে ব্যবসা করেন। বিকল্প কর্মসংস্থান বা নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা না করে শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
তিনি বলেন, বিষয়টিকে মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে হবে। সিটি করপোরেশন পরিকল্পিতভাবে হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে পথচারীদের চলাচল নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি জোরদার করা হবে।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ফুটপাত দখল শুধু নগরের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ, নিয়মিত নজরদারি এবং নগরবাসীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শু/আজা