ইউএনও কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নাটোর প্রতিনিধি
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষের জেরে নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা এসব মামলায় সরকারদলীয় ২৫ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১৪০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সোমবার লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু মাসুদ রানা এবং বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শুকুর আলী নিজ নিজ থানায় মামলা দুটি করেন।

লালপুর থানায় করা মামলায় ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১২ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ডের শুমারির জন্য তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল বাতিলের দাবিতে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে জড়ো হন। পরে ৪০ থেকে ৫০ জন ইউএনওর কার্যালয়ে ঢুকে বিক্ষোভ ও স্লোগান দিতে থাকেন।

সেসময় ইউএনও, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তাসহ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা কার্যালয়ে ছিলেন। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং নিয়োগের ফলাফল বাতিলের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।

একপর্যায়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে মারধর করে তাঁর শার্ট ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ করা হয়েছে। উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তাকে ধাক্কা দেওয়ার পাশাপাশি কার্যালয়ের চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্রে লাথি মেরে সেগুলো এলোমেলো করে ফেলা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ সময় ইউএনওর কক্ষে থাকা সিসি ক্যামেরা বন্ধ করার জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা ক্যামেরার তার ছিঁড়ে ফেলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কয়েকজন ইউএনওকে ঘিরে ধরে গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহার অনুযায়ী, ইউএনওকে কার্যালয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে ভেতরে থাকা ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা তাঁর শরীরে ও কক্ষে ডিম ছুড়ে মারেন। পরে বিক্ষোভকারীরা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে আবারও জড়ো হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বাগাতিপাড়া থানায় করা মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১২ আগস্ট সকালে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফলকে কেন্দ্র করে প্রায় শতাধিক ব্যক্তি উপজেলা পরিষদ ভবনের সামনে জড়ো হন। পরে তাঁরা মিছিল নিয়ে ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে আপত্তিকর স্লোগান দিতে থাকেন।

বিক্ষোভকারীরা ইউএনওর কার্যালয়ের দরজা খুলে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে কার্যালয়ের বারান্দায় থাকা কয়েকটি ফুলের টব ও একটি স্টিলের গেট ভাঙচুর করা হয়। বিক্ষোভকারীদের ছোড়া একটি প্লাস্টিকের চেয়ার ইউএনও কার্যালয়ের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তার কপালে আঘাত করে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার সময় উপজেলা ভূমি অফিসের এক কর্মচারী ভিডিও ধারণ করছিলেন। তাঁকে মারধর করে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। পরে কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে ইউএনওর কক্ষে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলে তাঁরা সেখানে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ইউএনওর টেবিলে আঘাত করে আপত্তিকর ভাষায় কথা বলা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডের প্রকাশিত ফলাফলে যেসব রোল নম্বর নিয়ে আপত্তি রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার জন্য বিক্ষোভকারীদের বলা হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁরা নির্দিষ্ট অভিযোগ না দিয়ে পুরো ফলাফল বাতিলের দাবি জানিয়ে চাপ সৃষ্টি করেন বলে উপজেলা প্রশাসনের অভিযোগ।

ইউএনও তাঁদের দাবির আইনগত ভিত্তি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরদিন আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটবে বলে বিক্ষোভকারীরা হুমকি দিয়েছিলেন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসনের অভিযোগ, নিয়োগের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত হলেও একপর্যায়ে তা সরকারি কার্যালয়ে প্রবেশ, ভাঙচুর, কর্মকর্তাদের ওপর হামলা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় রূপ নেয়। এ কারণে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পৃথক দুটি এজাহার করা হয়েছে।

লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় একটি লিখিত এজাহার পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

বাগাতিপাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রাজ্জাকও ইউএনও কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় লিখিত এজাহার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা জানিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি, নাটোরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডের মতো সরকারি কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োগ ও বাছাই নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা কীভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে, নাটোরের দুই উপজেলার ঘটনা সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে সরকারি কার্যালয়ে হামলা, কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলো এখন তদন্তের মাধ্যমে কতটা প্রমাণিত হয়, সেটিই হবে পরবর্তী বিষয়।
 

বিষয়:

ইউএনও নাটোর
এলাকার খবর

সম্পর্কিত