ঋণ করে লেবাননে শফিকুল-নাহিদুল, ইসরায়েলি ড্রোনে ‘স্বপ্ন’ শেষ

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
লেবাননে ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় নিহত নাহিদুল ইসলাম (বায়ে) এবং শফিকুল ইসলাম। ছবি:
লেবাননে ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় নিহত নাহিদুল ইসলাম (বায়ে) এবং শফিকুল ইসলাম। ছবি:

ঋণের বোঝা মেটাতে আরও কিছু ঋণ করে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে লেবাননে পাড়ি দিয়েছিলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শফিকুল ইসলাম। তখনও ইরানে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন শুরু হয়নি। ফলে ইরানের পাশের দেশ লেবাননে যেতে কোনো সমস্যা হয়নি শফিকুলের; পরিবারও কোনো শঙ্কা দেখেনি।

শফিকুল যাওয়ার পর পরই এই যুদ্ধের বারুদ গোটা পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে; যার জেরে ইরানের প্রতিবেশী দেশ লেবাননেও লাগাতার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে লেবাননের মানুষ বাস্তুচ্যুতও হয়, রকেট ও ড্রোন হামলায় নিহতের খবরও আসতে থাকে।

শফিকুল (৩৮) বাস করতেন দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ের এলাকার জেবদিন গ্রামে। সেখানে তার সঙ্গে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার নাহিদুল ইসলামও (২৬) বসবাস করতেন। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলার কারণে তারা আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন। সেটা পরিবারকে জানিয়ে ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে তাদের সরে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না।

কয়েকদিন আগে শফিকুল পরিবারকে জানিয়েছিলেন, কয়েকদিন আগেই তাদের এলাকায় একটি রুটির দোকানের ভ্যানে হামলা চালানো হলে স্থানীয় দুজন নিহত হন। তার পর থেকে আতঙ্ক আরও বেড়েছিল তাদের।

তার মধ্যেই সোমবার মধ্যদুপুরে শফিকুল-নাহিদুলের বাসস্থানেও ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে ঘটনাস্থলেই শফিকুল ও নাহিদুল মারা যান বলে লেবাননের বৈরুত দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) ও দূতালয় প্রধান মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন জানান।

এদিন শফিকুল-নাহিদুলের সঙ্গে সিরিয়ার এক যুবকও মারা যান।

বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাতে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা ইউএনও অর্ণব দত্ত মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, দুই বাংলাদেশির মরদেহ নাবাতিয়ের নাবিহ বেররি হাসপাতালে রাখা হয়েছে।

এ নিয়ে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আট বাংলাদেশি নাগরিক বিভিন্ন দেশে প্রাণ হারানোর কথা জানা গিয়েছে। এর মধ্যে লেবাননে সর্বোচ্চ তিনজন, সংযুক্ত আবর আমিরাত ও সৌদি আরবে দুজন করে এবং বাহারাইনে একজন নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া লেবাননে আরও দুই বাংলাদেশি নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।

শফিকুল পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস
ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর একমাত্র ছেলে শফিকুল ইসলাম ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দরিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া শফিকুলের পরিবার একসময় সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘরে থাকতেন। পরে তিনটি এনজিও থেকে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পাকার বাড়ি নির্মাণ করেন। সেই ঋণ শোধ আর পরিবারের স্বচ্ছলতার আশায় ২০ রমজান তিনি লেবাননের উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন।

বাড়িতে বাবা-মা ছাড়াও স্ত্রী রুমা খাতুন ও দুই শিশুকন্যাকে রেখে গিয়েছিলেন। এপ্রিল মাসে তিনি প্রথম পরিবারের কাছে ৪০ হাজার টাকা পাঠান। কথা ছিল, ঈদকে সামনে রেখে এ মাসেও আরেকটু বেশি করে টাকা পাঠাবেন। পরিবার আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু তার আগেই শফিকুলের ‘স্বপ্ন’ শেষ হয়ে গেছে; এখন পরিবারজুড়ে চলছে কেবল কান্নার রোল।

মঙ্গলবার সকালে শফিকুলের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী রুমা খাতুন বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। পাশে দুই শিশুকন্যা নির্বাক হয়ে বসে আছে। তাদের বোঝার বয়স হয়নি- বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুমা খাতুন বলছিলেন, “আমার দুই মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিল। এখন আমি কীভাবে বাঁচব? সরকার যেন দ্রুত ওর মরদেহ দেশে আনে।”

বৃদ্ধ বাবা আফসার আলী চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, “ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম সুখের আশায়। এখন সে লাশ হয়ে ফিরছে। আমি শুধু শেষবার ছেলের মুখটা দেখতে চাই।”

স্থানীয় শিক্ষক আল কালাম আবু ওয়াহিদ বলেন, “২০ রমজান অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিল শফিকুল। পরিবারের জন্য কিছু করবে বলেই গিয়েছিল।”

সকালে শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবার দুটিকে সহযোগিতার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করা হবে।”


‘নাহিদুল বলেছিল, সব ঋণ শোধ করবে’
নাহিদুল ইসলামের বাড়ি আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামে। সেখানে গিয়েও দেখা গেছে কান্নার রোল, শোকের পরিবেশ। পরিবারের সদস্যরা জানান, নাহিদুল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সংসার চালাতে গিয়ে নাহিদুলের বাবা আব্দুল কাদের অনেক ঋণ করে ফেলেছিলেন। সেই ঋণ পরিশোধের চাপ ছিল পরিবারের উপর।

বাবার ঋণের বোঝা কমাতে নিজের শেষ সম্বল বিক্রি করে এবং সুদে টাকা ধার নিয়ে মাস তিনেক আগে লেবাননে পাড়ি জমান নাহিদুল। যাওয়ার পর এপ্রিল মাসে তিনি পরিবারের কাছে ৩৭ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন।

নাহিদুলের বাবা আব্দুল কাদের কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “ছেলে বলেছিল, সব ঋণ শোধ করবে। আজ আমার ছেলে নেই, আমি এই ঋণের বোঝা নিয়ে কী করব?”

মা নুরুন্নাহার খাতুন ছেলের শোকে শয্যাশায়ী। পুরো কাদাকাটি গ্রামজুড়ে এখন শোকের আবহ।

ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, “পরিবার দুটি অত্যন্ত অসহায়। ঋণ করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এখন সন্তান হারিয়ে তারা মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব।”

স্থানীয়দের দাবি, সরকার যেন দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ায়।

সূত্র : বিডিনিউজ

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত