বঙ্গোপসাগরের তীরে গড়ে উঠা সমুদ্র শহর কক্সবাজার দেশের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় জেলা। প্রতিদিন গভীর সমুদ্রে যান শত শত জেলে, সৈকতে ভিড় করেন হাজারো পর্যটক এবং বিমানবন্দর দিয়ে নিয়মিত উড্ডয়ন ও অবতরণ করে বিমান। অথচ এই পুরো উপকূলের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কক্সবাজার ডপলার রাডার স্টেশনটি তিন বছর ধরে অচল।
সরেজিমেন গিয়ে দেখা যায়, কক্সবাজার শহরের সার্কিট হাউস-সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়ায়, সমতল থেকে ১৬০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই রাডার স্টেশনটি জরাজীর্ণ অচল অবস্থায় পড়ে আছে। রাডার স্টেশনের পাহাড়টি বৃষ্টিতে ক্ষয়ে তিন পাশদিয়ে ধসে পড়ার আশংকা করেন স্হানীয় জনগণ।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৯৬৯ সালে সুইডিশ শিশুকল্যাণ সংস্থা ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহযোগিতায় কক্সবাজার রাডার স্টেশনটি স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ২২ এপ্রিল জাপান সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় রাডার সিস্টেমের উন্নয়ন করা হয়।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কক্সবাজার রাডারটির মেয়াদকাল ১০ থেকে ১২ বছর। ২০২৩ সালের ৪ আগস্ট রাডার স্টেশনটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। এরপর থেকে রাডারটি কাজ করছে না।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে রাডারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস, মেঘের সৃষ্টি ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। কক্সবাজারে বিমানবন্দর থাকায় বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের ক্ষেত্রেও রাডারের তথ্য বিশেষ সহায়ক। অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি হওয়া মেঘের অবস্থান, প্রকৃতি ও গতিপথ নির্ধারণেও এর গুরুত্ব অনেক। রাডার থেকে পাওয়া তথ্য ঢাকায় পাঠানো হতো। সেখানে বিশেষজ্ঞরা সেগুলো বিশ্লেষণ করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরি করতেন। কিন্তু রাডার অচল থাকায় এখন সরাসরি এই তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
বিমানবন্দরের জন্য আবহাওয়ার তথ্য সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতি ঘণ্টায় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের মাধ্যমে পাইলটদের তাপমাত্রা, শিশিরাঙ্ক (ডিউ পয়েন্ট), আর্দ্রতা, কিউএনএইচ (বায়ুচাপ), দৃশ্যমানতা, বাতাসের গতি ও দিকসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়া হয়। এছাড়া বৃষ্টিপাত, মেঘের উচ্চতা ও প্রকৃতির তথ্যও সরবরাহ করা হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন বজ্রঝড় বা ঘন মেঘের সময়, প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর তথ্য হালনাগাদ করা হয়।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, স্যাটেলাইটসহ অন্যান্য প্রযুক্তি দিয়ে পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও কক্সবাজারের স্থানীয় পর্যায়ের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা কমে গেছে। গভীর সমুদ্রে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় জেলেদের একমাত্র ভরসা রেডিও। তাই হঠাৎ দুর্যোগের আগাম সতর্কতায় ডপলার রাডার ছিল সবচেয়ে কার্যকর প্রযুক্তি। শুধু জেলেদের জন্য নয়, সমুদ্রসৈকতে থাকা পর্যটক ও বিমান চলাচলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের এই জেলায় জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব রয়েছে আবহাওয়া জলবায়ুর। আবহাওয়া কেমন যাবে, কবে খরা, কবে বৃষ্টিপাত, কখন কী পরিস্থিতি এসব বিষয়ে জানার শেষ ভরসা আবহাওয়া অফিস। কিন্তু আবহাওয়া অফিসের এখন বেহাল দশা। উন্নত প্রযুক্তির এ সময়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাসের জন্য চেয়ে থাকে আকাশপানে। খোদ নিজেদের দুরবস্থার কথা জানালেন আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ নিয়ে জনসাধারণের মাঝে হাসাহাসি তো আছেই। আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়ে মানুষের আস্থা এখন তলানিতে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, কক্সবাজারের রাডারটি ২০০৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত চালু ছিল। পরে যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এটি বন্ধ হয়ে যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা কয়েক দফা চেষ্টা করেও এটি সচল করতে পারেননি। শুধু কক্সবাজার নয়, পটুয়াখালীর খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডারও একই সঙ্গে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইও শেষ হয়েছে। জাপানের প্রতিনিধি দল জানিয়েছে, বর্তমান ভবন ও অবকাঠামো ব্যবহারযোগ্য রয়েছে, শুধু পুরোনো যন্ত্রপাতি বদলাতে হবে। প্রকল্পটি এখনো মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। প্রতি মাসেই এ বিষয়ে ঢাকার দফতর থেকে চিঠি আসে। তবে এখনো প্রকল্প অনুমোদনের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, বিষয়টি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় অবগত রয়েছে এবং এর আগেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
শু/আজা