পাগলাটে ম্যাচ দেখল বিশ্বকাপ; সাকার হ্যাটট্রিকেও থামাতে পারল না ফ্রান্সের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন
ফুটবল ইতিহাসে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খুব কমই এমন নাটকীয়তা উপহার দিয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই বিরল ম্যাচগুলোর একটিই উপহার দিল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। ১০ গোলের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ৬-৪ ব্যবধানে জিতে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড। ম্যাচটি ছিল কৌশল, আক্রমণ, প্রত্যাবর্তন এবং মানসিক দৃঢ়তার এক অনন্য প্রদর্শনী।
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচগুলো সাধারণত আনুষ্ঠানিকতার আবহ তৈরি করলেও ২০২৬ সালের এই ইংল্যান্ড–ফ্রান্স লড়াই স্মরণীয় হয়ে থাকবে গোলের বন্যা, নাটকীয় প্রত্যাবর্তন এবং বুকায়ো সাকার অসাধারণ হ্যাটট্রিকের জন্য। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিনোদনপূর্ণ তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ হিসেবে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।
ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল অবিশ্বাস্য গতি। মাত্র তৃতীয় মিনিটে ডেকলান রাইস গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। ১৮ মিনিটে এজরি কনসা ব্যবধান বাড়ান। এরপর ম্যাচের নায়ক বুকায়ো সাকা নিজের প্রথম গোলটি করেন ৩৭ মিনিটে। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে করেন নিজের দ্বিতীয় ও দলের চতুর্থ গোল। তবে চার গোল পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ ছাড়েনি ফ্রান্স। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ৪৮ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পে গোল করে আশা জাগান। ৫৪ মিনিটে ব্র্যাডলি বারকোলা ব্যবধান কমিয়ে ৪-২ করেন। ৬৬ মিনিটে এমবাপ্পের দ্বিতীয় গোলের পর ফরাসিরা যখন ম্যাচে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখছিল তখনই বুকায়ো সাকা ৮৭ মিনিটে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে ইংল্যান্ডকে আবারও নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যান। যোগ করা সময়ে ৯০+৬ মিনিটে উসমান দেম্বেলে ৪-৬ ব্যবধান করলেও ততক্ষণে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইংল্যান্ডের সাফল্য খুব বেশি নয়, ১৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পর দীর্ঘ ছয় দশক ধরে শিরোপার অপেক্ষায় রয়েছে।১৯৯০ ও ২০১৮ সালে চতুর্থ এবং ২০২৬-এ তৃতীয়—এটিও ইংলিশ ফুটবলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সান্ত্বনা। আর ১৯৯৮ ও ২০১৮এ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবারও শিরোপার খুব কাছে পৌঁছেও সেমিফাইনালে বিদায় নিয়ে হারল তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও।
কেন জিতল ইংল্যান্ড? শুরু থেকে তারা অবিশ্বাস্য হাই প্রেসিং ফুটবল খেলেছে। ফ্রান্সের মিডফিল্ডকে সময় না দিয়ে দ্রুত বল দখল করেছে। দুই প্রান্ত দিয়ে সাকার গতিময় দৌড় এবং বক্সে নিখুঁত ফিনিশিং ফরাসি রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সেট-পিস এবং ট্রানজিশন—দুই ক্ষেত্রেই ইংল্যান্ড ছিল অনেক বেশি কার্যকর।
তবে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে চিত্র পাল্টে যায়। চার গোল পিছিয়ে থেকেও ফ্রান্স আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায়। এমবাপ্পে ও বারকোলার গতি ইংল্যান্ডের রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলে। মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণও বাড়িয়ে ফেলে ফরাসিরা। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল প্রথমার্ধে করা ভুলগুলোর মূল্য। চার গোলের ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে রক্ষণ আরও উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
তবে এই ম্যাচ আবারও মনে করিয়ে দিল, আধুনিক ফুটবলে চার গোলের ব্যবধানও নিরাপদ নয়! প্রমাণ করল, শুরুতে তৈরি করা বিশাল লিড কতটা মূল্যবান হতে পারে। ফ্রান্স লড়াইয়ে ফিরেছিল সাহস, গতি ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে; কিন্তু ইংল্যান্ড জিতেছে সংগঠিত পরিকল্পনা, কার্যকর ফিনিশিং এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে স্নায়ু ধরে রাখার ক্ষমতায়।