অস্বাভাবিক জীবনধারার পরিবর্তন ও উত্তম খাদ্যাভ্যাস তৈরি না হওয়ায় বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে উদ্বেগজনক হারে মৃত্যু বাড়ছে। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশ হয়েছে হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যানসার, মানসিক সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক রোগে। দেশে ৫২ শতাংশ পুরুষ ধূমপায়ী এবং প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। ২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ১ কোটি ৩১ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং একই বছরে এ রোগে ৭৫ হাজার ৬১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আজ বুধবার দুপুরে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে ‘জেলার মানুষের খাদ্য বৈচিত্র্যতা এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য ফলিত পুষ্টি’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান), রংপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ছাদেকুল ইসলাম প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, রংপুরের মানুষের খাদ্যতালিকায় ৬৭ শতাংশই থাকে দানাদার খাদ্য। একজন ব্যক্তির প্রতিদিন ৫ গ্রাম লবণ খাওয়ার কথা থাকলেও গড়ে খাচ্ছেন ১১ গ্রাম। ২০ গ্রাম চিনি খাওয়ার কথা থাকলেও খাচ্ছেন ৫ গ্রাম। শাকসবজি ও ফলমূল ৪০০ গ্রাম খাওয়ার কথা থাকলেও খাচ্ছেন ৩১৭ গ্রাম।
তিনি আরও বলেন, জেলার শতভাগ মানুষ নিরাপদ উৎস থেকে পানি পান করছেন। উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা রয়েছে ৬০ শতাংশ মানুষের। ৯৬ শতাংশ মানুষের হাত ধোয়ার স্থানে পানি ও সাবান রয়েছে এবং ৫৯ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ খায়।
ড. ছাদেকুল ইসলাম বলেন, বিশ্বে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার কারণে প্রতি বছর ৩০ লাখ মানুষের স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলমূল কম খাওয়ার কারণে ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বাদাম, বীজ, শাকসবজি, সামুদ্রিক খাবার থেকে পাওয়া ওমেগা-৩ এবং আঁশজাতীয় খাবারের পরিমাণ কম হওয়াকেও মৃত্যুর বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সেমিনারে জানানো হয়, বিশ্বে খাদ্যাভ্যাস-সম্পর্কিত মৃত্যুর মধ্যে বড় একটি অংশ হৃদরোগে হচ্ছে। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের আয়ু কমে যাচ্ছে বলেও সেমিনারে উল্লেখ করা হয়।
উত্তম খাদ্যাভ্যাস তৈরি ও অস্বাভাবিক জীবনধারা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথাও সেমিনারে তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, দেশে রোগ সম্পর্কিত গবেষণা কম হওয়ায় রোগের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি হাসপাতালে রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। দেশে ১৫২টি আইন ও নীতিমালা থাকলেও খাদ্য নিরাপদ হচ্ছে না। ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের নমুনা পরীক্ষায় ৩৩ শতাংশ নমুনা অনিরাপদ পাওয়া গেছে।
বারটানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা।
জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, নতুন প্রজন্মের পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে এখন থেকেই সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আগের প্রজন্মের সময়ে পুষ্টি বিষয়ে প্রচারণা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে অনেক অভিভাবকই পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানতেন না।
বর্তমান প্রজন্মের সামনে অস্বাস্থ্যকর, প্রক্রিয়াজাত ও কৃত্রিম উপাদানযুক্ত খাবারের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিশু ও তরুণদের পুষ্টি বিষয়ে সচেতন করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে বারটানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, খাদ্যের পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে শুধু খাবার গ্রহণের দিকে নজর দিলেই হবে না। মাটি থেকে শুরু করে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রান্না এবং খাবার প্লেটে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্যের পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা কী খাচ্ছি, তার পাশাপাশি সেই খাবার থেকে শরীর পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এ জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে পুরো খাদ্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমান বজায় রাখা জরুরি। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এর ফলে শুধু শারীরিক ক্ষতিই নয়, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর আর্থিক চাপও তৈরি হচ্ছে। সুস্থ থাকতে সবার স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান) আয়োজিত এ সেমিনারে কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ৫০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন। এ সময় নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, উত্তম খাদ্যাভ্যাস তৈরি, ভেজাল খাদ্য বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে অভিযান এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা।