গাজীপুরের বাইমাইল নয়, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার থেকেই প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাজধানীর মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’কে। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, প্রিজন ভ্যানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস নিজেই ভ্যানের তালা খুলে তাঁকে নামিয়ে দেন। আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষমাণ একটি প্রাইভেটকারে পিচ্চি রাজাকে তুলে দেওয়া হয়। ওই গাড়িতে তাঁর বোন তাসলিমাসহ কয়েকজন ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে ঘটনাটি গোপন করতে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে তাঁর পালিয়ে যাওয়ার একটি ভিন্ন বয়ান তৈরি করা হয়।
সোমবার গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) সদর দপ্তরে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার। তিনি বলেন, অপরাধী যে-ই হোক, এমনকি পুলিশ সদস্য হলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্তে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আসামিদের প্রিজন ভ্যানে করে ঢাকার আদালতে নেওয়া হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে রাতে তাঁদের আবার কাশিমপুরে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। পথে রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে প্রিজন ভ্যানটি থামে।
তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাতে পুলিশ জানায়, সেখানে প্রিজন ভ্যানের এসকোর্ট ইনচার্জ এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস চালক নায়েক কামাল হোসেনের কাছ থেকে ভ্যানের চাবি নেন। এরপর তিনি পিচ্চি রাজা ও খাইরুল বাশার নামে দুই হাজতিকে ভ্যান থেকে নামান। খাইরুল বাশারকে ভ্যানের সামনের অংশে চালকের পাশে বসানো হলেও পিচ্চি রাজা আর ভ্যানে ওঠেননি।
জিএমপি কমিশনারের ভাষ্য, আগে থেকেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁতীবাজারে একটি প্রাইভেটকার অপেক্ষা করছিল। গাড়িতে পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাসহ কয়েকজন ছিলেন। সাদাপোশাকে থাকা এসআই প্রবীর নিজেই পিচ্চি রাজাকে ওই গাড়িতে তুলে দেন। এরপর বাকি আসামিদের নিয়ে প্রিজন ভ্যানটি কাশিমপুরের দিকে রওনা হয়।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, পিচ্চি রাজাকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার পর এসআই প্রবীর সরাসরি কারাগারে যাননি। তিনি পরে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় নাওজোড় হাইওয়ে থানার সামনে এসে আবার প্রিজন ভ্যানে ওঠেন। এরপর কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছে পিচ্চি রাজার পলায়নের বিষয়ে ভিন্ন একটি ঘটনা সাজানো হয়।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ যে তথ্য দিয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল—বাইমাইল বা নাওজোড় এলাকায় পৌঁছানোর পর পিচ্চি রাজা শৌচকর্মের কথা বলে প্রিজন ভ্যান থেকে নামেন এবং সুযোগ বুঝে দৌড়ে পালিয়ে যান। কিন্তু জিএমপির গঠিত পর্যবেক্ষণ কমিটির তদন্তে ওই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল পাওয়া যায়নি। তদন্তে পলায়নের স্থান হিসেবে তাঁতীবাজারের তথ্য সামনে আসে।
ঘটনায় সরাসরি সহযোগিতার অভিযোগে এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন এবং পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে নগদ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পিচ্চি রাজাকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছিল কি না, তা তদন্তে এখনো নিশ্চিত হয়নি।
এ ঘটনায় প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা আরও তিন কনস্টেবল—মো. জাকির হোসেন, মো. সাকিব ও শাকিল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়েছে। গ্রেপ্তার দুই পুলিশ সদস্য ছাড়া অন্য তিনজনকে নজরদারিতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার পর প্রকৃত ঘটনা গোপন করে ভিন্ন তথ্য দেওয়ার অভিযোগে কোনাবাড়ী থানায় মামলা করা হয়েছিল। পরে মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় জিএমপির ডিবি দক্ষিণ বিভাগকে। তদন্তে প্রিজন ভ্যানের গতিপথ, দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা এবং পিচ্চি রাজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হয়।
জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার বলেন, পুরো ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধে পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারে ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে ডিবির একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।
তবে তদন্তে পলায়নের স্থান ও পদ্ধতি সম্পর্কে নতুন তথ্য বেরিয়ে এলেও এখনো অধরা পিচ্চি রাজা। ঘটনার আট দিন পার হলেও তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা ওরফে বাদশা মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত প্রায় ৩০টি মামলা রয়েছে। চলতি বছরের ১৯ মে নেপাল থেকে দেশে ফেরার পথে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাঁকে, তাঁর স্ত্রী ও শ্যালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।