- জাতিসংঘে আইসিসির তীব্র সমালোচনা; আদালটির ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) থেকে সদস্য দেশগুলোকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি আইসিসির তীব্র সমালোচনা করেন এবং আদালটিকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বলে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক বাহিনীর সদস্যদের এমন একটি আদালতের বিচারের আওতায় আসতে দেবে না, যেটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী এবং ‘লোকদেখানো বিচারের’ আয়োজন করে বলে মনে করেন। আইসিসির সদস্য দেশগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, তারা যেন অবিলম্বে আদালটি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে আইসিসিকে ‘নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিষ্ঠান’ ও ‘দুষ্ট গোষ্ঠী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদস্যদের আইসিসির আওতায় বিচারের সম্ভাবনার বিরোধিতা স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
ট্রাম্পের এ বক্তব্যের মধ্যেই আইসিসির ওপর আরও ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে তাঁর প্রশাসন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, এবার নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মীর পরিবর্তে পুরো আদালতকে লক্ষ্য করে ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে আইসিসির সঙ্গে যুক্ত বেশির ভাগ আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন সীমিত বা নিষিদ্ধ হতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালীন চলতি সপ্তাহে অথবা এর পরপরই এ বিষয়ে নির্বাহী পদক্ষেপ চূড়ান্ত করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে আইসিসির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপের ধরনে বড় পরিবর্তন আসবে। এর আগে আদালটির নির্দিষ্ট কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। এবার পুরো প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক কার্যক্রমকে লক্ষ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইসিসির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা চালু করেন। ওই আদেশে আইসিসির এমন কার্যক্রমকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির জন্য ‘অস্বাভাবিক ও অসাধারণ হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আদালটির কর্মকর্তাদের সম্পদ জব্দ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থাও ওই আদেশে রাখা হয়।
ওই সময় ট্রাম্প প্রশাসন বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইসিসির বিচারিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করে। যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়। ইসরায়েলও আদালটির সদস্য নয়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। গাজা যুদ্ধের সময় সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্তের ভিত্তিতে এ পরোয়ানা জারি করা হয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে।
২০২৬ সালেও আইসিসিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। জুলাইয়ে রয়টার্স জানিয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন আদালটির ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, ভিসা বাতিল এবং আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিভিন্ন পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশকে আইসিসি থেকে কূটনৈতিকভাবে দূরে রাখার জন্য মার্কিন কর্মকর্তারা চাপ দিচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
এর মধ্যে আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন ট্রাম্প প্রশাসনের আইসিসিবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ, আদালটিকে দুর্বল করার এ ধরনের পদক্ষেপ সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য তাই আইসিসি নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থানের ধারাবাহিকতারই আরেকটি প্রকাশ। একদিকে সদস্য দেশগুলোকে আদালটি থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি, অন্যদিকে তাঁর প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটির ওপর আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আইসিসি ২০০২ সালে রোম সংবিধির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আগ্রাসনের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচার পরিচালনা করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আদালটির সদস্য নয় এবং আইসিসির এখতিয়ার ও কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাদের আপত্তি রয়েছে।