ধ্বংসস্তূপে গাজা, নিহত ৭৪ হাজারের বেশি; যুদ্ধবিরতির পরও হামলায় প্রাণ গেছে ১,৪৬০ জনের
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর তিন বছর পূর্ণ হলো। এই সময়ে ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি। ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৪৬০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ১১৬ জন আহত হয়েছেন।
তিন বছর পূর্তিতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে। এ সংখ্যা গাজার যুদ্ধপূর্ব জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশের সমান—অর্থাৎ গড়ে প্রতি ৩০ জনে একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২১ হাজারের বেশি শিশু রয়েছে বলে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে আল-জাজিরা জানিয়েছে।
তবে এই সংখ্যা চূড়ান্ত নয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা এবং নিখোঁজ মানুষের হিসাব পুরোপুরি যুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত প্রাণহানি আরও বেশি হতে পারে বলে বিভিন্ন মানবিক সংস্থা ও গবেষকেরা মনে করেন।
### প্রতি ১৩ জনে একজন আহত
যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতির আরেকটি বড় সূচক আহতের সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল পর্যন্ত গাজায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৪৩ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ হাজার মানুষের এমন আঘাত রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের অঙ্গচ্ছেদ হয়েছে বলে WHO-এর হিসাব।
পরবর্তী মাসগুলোতেও আহতের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে তিন বছরে মোট আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে বলে সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
### যুদ্ধবিরতিতেও থামেনি হামলা
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বড় আকারের যুদ্ধ কমলেও গাজায় নিয়মিত হামলা ও প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির এক বছর পরও ইসরায়েল গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সামরিক তৎপরতা চলছে।
ইসরায়েলের দাবি, তাদের হামলার লক্ষ্য হামাসের সামরিক অবকাঠামো ও যোদ্ধারা। হামাস এসব অভিযোগের অনেকগুলো অস্বীকার করেছে। যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর, তা নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।
### গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিপর্যস্ত
তিন বছরের যুদ্ধ গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যত বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় বা OCHA-এর ২০২৬ সালের বিভিন্ন পরিস্থিতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুদ্ধের আগে মানচিত্রভুক্ত স্বাস্থ্যসেবা পয়েন্টগুলোর অর্ধেকেরও কম এখন কার্যকর রয়েছে। এপ্রিলের হিসাবে ৬৩০টি ম্যাপ করা স্বাস্থ্যসেবা পয়েন্টের মধ্যে ২৬৯টি কার্যকর ছিল; জুলাইয়ে কার্যকর সেবা পয়েন্টের হার ছিল প্রায় ৪৪ শতাংশ। অধিকাংশ কেন্দ্রই আংশিক সক্ষমতায় চলছে।
ওষুধ, ডায়ালাইসিস সামগ্রী, পরীক্ষাগার সরঞ্জাম, অক্সিজেন ও অন্যান্য জরুরি চিকিৎসা উপকরণের ঘাটতিও অব্যাহত রয়েছে। OCHA জানিয়েছে, এসব উপকরণ প্রবেশে বিধিনিষেধ ও বিলম্ব স্বাস্থ্যসেবা আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।
### পানির সংকট আরও গভীর
যুদ্ধের পাশাপাশি পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সংকট গাজার মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন, কূপ, পানি শোধনাগার ও বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট অব্যাহত রয়েছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষ বর্তমানে আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রীর সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছেন। ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছে, যেখানে আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নেই।
### ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস
তিন বছরের সামরিক অভিযানে গাজার নগর অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রয়টার্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী কোনো না কোনো সময় বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের পাশে তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন।
OCHA-এর সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার মানুষ—মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৪ শতাংশ—আশ্রয় ও গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছেন।
### শিক্ষাব্যবস্থাও বিপর্যস্ত
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলোর একটি পড়েছে শিশুদের শিক্ষায়। বহু স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে যুদ্ধের মধ্যেও অস্থায়ী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর চেষ্টা চলছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষা ক্লাস্টার ৬১০টি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার শিশু-কিশোরকে কাঠামোবদ্ধ শিক্ষার আওতায় আনার কথা জানিয়েছে।
### সাংবাদিকদের জন্যও ভয়াবহ পরিস্থিতি
গাজার যুদ্ধ সাংবাদিকদের জন্যও অন্যতম প্রাণঘাতী সংঘাতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থার হিসাবে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন।
গাজায় বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারও কঠোরভাবে সীমিত। ফলে স্থানীয় সাংবাদিকদের ওপর যুদ্ধের প্রত্যক্ষ চিত্র তুলে ধরার দায়িত্ব আরও বেড়েছে।
### তিন বছরে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা কত?
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্য উদ্ধৃত করে ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী পুরো অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে গাজায় প্রায় ৬৫ হাজার, লেবানন ও সিরিয়ায় ২৮ হাজার, ইরানে ৪ হাজার ৫০০ এবং ইয়েমেনে ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা বলা হয়েছে।
তবে ‘লক্ষ্যবস্তু’ বা target-এর সংখ্যা সরাসরি হামলার সংখ্যা বা নিহত মানুষের সংখ্যার সমান নয়। এটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দেওয়া হিসাব এবং এর মধ্যে একই স্থানে একাধিক হামলা বা সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিভিন্ন শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
### শুরু হয়েছিল ৭ অক্টোবরের হামলা দিয়ে
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী দক্ষিণ ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালায়। ইসরায়েলি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এর পরই গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। তিন বছর পর সেই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক তীব্রতা কমলেও গাজায় মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসের চিত্র এখনো বদলায়নি।
একদিকে ইসরায়েলে ৭ অক্টোবরের হামলার নিহতদের স্মরণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে গাজায় তিন বছরের যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন লাখো ফিলিস্তিনি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক বছর পরও ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং পুনর্গঠনের পথ এখনো অনিশ্চিত।