ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও সমমনা ছাত্রসংগঠনগুলো। শনিবার ব্যাপক ধরপাকড়ের পর রোববারও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির নেতারা। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় দিল্লির জন্তর মন্তরে নতুন বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। তবে রোববার সকালের সর্বশেষ সংবাদপ্রতিবেদনগুলোতে কর্মসূচি শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সিইসির পদত্যাগ দাবি করছে সিজেপি। দলটির অভিযোগ, তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়া বা অনিয়মের অভিযোগকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। বিজেপি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
সিজেপির জাতীয় সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা অজিঙ্কা শিন্ডে জানিয়েছেন, শনিবারের পুলিশি অভিযানের পরও আন্দোলন থামবে না। তিনি সমর্থকদের জন্তর মন্তরে জড়ো হওয়ার পাশাপাশি পুলিশ বাধা দিলে সেখানেই প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দুই নেতা সৌরভ দাশ ও আশুতোষ রাঙ্কা আটক থাকায় আন্দোলনের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন শিন্ডে।
তিন নেতার আটক নিয়ে উদ্বেগ
শনিবার মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের দুই নেতা সৌরভ দাশ ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করে পুলিশ। দলটির অভিযোগ, আটকের পর দীর্ঘ সময় তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে পরিবার, আইনজীবী ও দলের নেতারা স্পষ্ট তথ্য পাননি। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে সিজেপি।
দিল্লি পুলিশের সূত্রের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ছেড়ে দেওয়া হলেও সিজেপির তিন নেতা আটক রয়েছেন এবং তাঁদের বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও আটক করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
দীপকের দাদির মৃত্যুর পর শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সিজেপির অভিযোগ, তাঁকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি এবং শেষকৃত্যে যাওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, মানবিক বিবেচনায় তাঁকে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এ বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
হাজারো আটক, পরে অধিকাংশ মুক্ত
শনিবার জন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লি পুলিশ অনুমতি না থাকার কথা জানিয়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভকারী, রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের আটক করা হয়। আটক ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে পার্থক্য রয়েছে—কিছু প্রতিবেদনে তিন হাজারের বেশি, অন্যগুলোতে সাত হাজারের বেশি মানুষের আটকের কথা বলা হয়েছে। পরে অধিকাংশ আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন ও ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। তাঁদেরও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
জন্তর মন্তরে পৌঁছানোর পথ বন্ধ থাকায় দিল্লির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দলে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ হয়। ডিল্লি হাট, সফদরজং ফ্লাইওভার, রাজঘাট ও কনট প্লেসের আশপাশে বিক্ষোভকারীদের আটক করে পুলিশ। অর্থনীতিবিদ ও অধিকারকর্মী জ্যঁ দ্রেজসহ কয়েকজন গবেষক ও শিল্পীকেও আটক করা হয় বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেট্রো চলাচল স্বাভাবিক, সতর্কতা দিল্লি পুলিশের
বিক্ষোভ ঘিরে শনিবার দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা, ব্যারিকেড, যান চলাচলে বিধিনিষেধ এবং মেট্রোর একাধিক স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ রাখা হয়। রোববার সকালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লি মেট্রোর সব স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ আবার খুলে দেওয়া হয়েছে এবং স্বাভাবিক সূচি অনুযায়ী ট্রেন চলাচল করছে। <Cite refs={["turn361679search5"]}/>
তবে নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কায় দিল্লি পুলিশ রোববারও নিউ দিল্লি ও মধ্য দিল্লির বিভিন্ন সড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছে। বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও আন্তরাজ্য বাস টার্মিনালে যাতায়াতকারীদের অতিরিক্ত সময় হাতে নিয়ে বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মুম্বাইয়েও বিক্ষোভ, জাতিসংঘের উদ্বেগ
দিল্লির বাইরে মুম্বাইসহ অন্য শহরেও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে কর্মসূচি থেকে চার শতাধিক মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ মামলা করেছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী ও অভিনেতা ইমরান খান।
দিল্লিতে ব্যাপক আটকের ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে জেনেভায় ভারতের স্থায়ী মিশন বলেছে, দেশটির সংবিধানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রয়েছে, তবে জনশৃঙ্খলার স্বার্থে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। কর্তৃপক্ষ আইন মেনেই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে ভারতের বক্তব্য।
এদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বিরোধী নেতারা ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি এবং বিক্ষোভকারীদের আটকের বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী কর্মসূচি নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সোমবার দিল্লিতে বিরোধীদের আরও কর্মসূচি হতে পারে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিলেও রোববারের বিক্ষোভে কত মানুষ অংশ নেবেন এবং আটক নেতাদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ভোটার তালিকার অনিয়ম নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ, পুলিশের পদক্ষেপ এবং সরকারের প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।