একসময় বর্ষা এলেই খাল-বিল, নদী-নালা ও প্লাবনভূমিতে মিলত শোল, গজার, টাকি, পাবদা, টেংরা, কৈ, শিং, মাগুর, পুঁটি, চিতল ও বোয়ালের মতো নানা দেশি মাছ। গ্রামের হাট থেকে শহরের বাজার—সর্বত্রই ছিল এসব মাছের উপস্থিতি। এখন অনেক এলাকায় এসব মাছ আগের মতো সহজে মেলে না। কোনো কোনো মাছ পাওয়া গেলেও দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। ফলে ‘ভাতে-মাছে বাঙালি’ পরিচিতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দেশি মাছের স্বাদ ও বৈচিত্র্য ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে।
তবে দেশে মাছের মোট উৎপাদন কমে যাওয়াকেই এ সংকটের একমাত্র কারণ বলা যায় না। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদিত হয়েছে ৫০ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে বদ্ধ জলাশয়ে চাষ থেকে এসেছে ২৯ লাখ ৭৮ হাজার টন, আর নদী, হাওর, বিল ও প্লাবনভূমিসহ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে এসেছে ১৪ লাখ ১১ হাজার টন। অর্থাৎ মোট উৎপাদনের ৫৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ এসেছে বদ্ধ জলাশয়ের চাষ থেকে; উন্মুক্ত জলাশয়ের অবদান ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। বাকি মাছ এসেছে সামুদ্রিক উৎস থেকে।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৮৩–৮৪ অর্থবছরে দেশের মোট মাছ উৎপাদনে উন্মুক্ত জলাশয়ের অবদান ছিল ৬২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। চার দশকে তা কমে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশে নেমেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের বার্ষিক পরিসংখ্যানে এ পরিবর্তনের কারণ হিসেবে অতিরিক্ত আহরণ, মাছের আবাসস্থলের অবক্ষয় ও বিনাশ, জলাশয়ে পলি জমা এবং শিল্পবর্জ্য ও কৃষি রাসায়নিকের দূষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই দেশি মাছ নিয়ে সংকটের মূল দিকটি স্পষ্ট হয়। মাছের মোট উৎপাদন বাড়লেও প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের বৈচিত্র্য ও প্রাপ্যতা একই হারে বাড়ছে না। চাষের মাছের সরবরাহ দিয়ে বাজারের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব হলেও প্রাকৃতিক পরিবেশে দেশি প্রজাতির মাছের আবাসস্থল ও বংশবিস্তার রক্ষা না হলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ঠেকানো কঠিন।
আবাসস্থল সংকুচিত, বাড়ছে নির্বিচার আহরণ
মৎস্যবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেশি মাছ কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। নদী-খাল-বিল ভরাট ও দখল, পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, পলি জমা, দূষণ, কৃষিজমিতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও ছোট মাছ আহরণ—এসব কারণে দেশি প্রজাতির স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মৎস্য বিভাগের তথ্যের বরাতে বলা হয়, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় একসময় প্রচুর পাওয়া যেত এমন ১০৮ প্রজাতির দেশি মাছের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ প্রজাতি টিকে আছে। লালমনিরহাটের মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতের তুলনায় দেশি মাছের প্রাপ্যতা কমে ১২ থেকে ১৫ শতাংশে নেমেছে। জলাশয় দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া এবং মাছের আবাসস্থল ও প্রজনন ব্যাহত হওয়াকে তিনি এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এটি পুরো দেশের মাছের প্রাপ্যতার পরিসংখ্যান নয়; রংপুর অঞ্চলের পরিস্থিতির চিত্র। তবে স্থানীয় এই তথ্য প্রাকৃতিক জলাশয় ও দেশি মাছের ওপর চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।
২০২২ সালে *মঙ্গাবে*-তে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আইইউসিএনের ২০১৫ সালের লাল তালিকার তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, বাংলাদেশের ২৫৩ প্রজাতির মিঠাপানির মাছের মধ্যে ৬৪ প্রজাতি হুমকির মুখে ছিল। এর মধ্যে নয়টি চরম বিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন এবং ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোস্তফা আলী রেজা হোসাইনের গবেষণার বরাতে বলা হয়, গত তিন থেকে চার দশকে প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে অন্তত ৩০ প্রজাতির ছোট ও মাঝারি আকারের মাছ হারিয়ে গেছে বলে তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে।
এখানে ‘প্রাকৃতিক পরিবেশে হারিয়ে যাওয়া’ আর কোনো প্রজাতি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। কোনো মাছের বুনো পরিবেশে অস্তিত্ব না পাওয়া গেলেও চাষ বা সংরক্ষিত পরিবেশে তার অস্তিত্ব থাকতে পারে। তাই দেশি মাছের অবস্থা মূল্যায়নে হালনাগাদ প্রজাতিভিত্তিক জরিপ জরুরি।
কি বলছেন সংশ্লিষ্টরা
নওগাঁর মান্দা উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের ইন্নি আব্দুল্লাহ মকুল বলেন, এক সময় এ অঞ্চলের নদী-নালা, খাল-বিল ও পুকুর-ডোবায় নানা প্রজাতির প্রচুর দেশিয় মাছ পাওয়া যেতো। কিন্তু এ বছর বর্ষা মৌসুমে খাল-বিল ও পুকুরে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় দেশি মাছের দেখা নেই। তাই দেশি মাছ শূন্য হয়ে পড়েছে মান্দার হাট-বাজারগুলো। মান্দা উপজেলার বিলদুবলা (চাঁনপুর) গ্রামের জেলে মকছেদ আলী বলেন, মাছ না পাওয়ায় আমরা খুব কষ্টে আছি। সংসার চালাতে খুব হিমশিম খেতে হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে ছেলে-মেয়ে নিয়ে কিভাবে চলবো সেই দুচিন্তায় আছি। আড়ৎদার আবুল কালাম আজাদ জানান, লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আশায় বুক বেঁধে আছি। প্রতি বছর বর্ষার শুরুতেই আড়তে প্রচুর মাছ আসে। এবারও সেই আশায় ছিলাম। কিন্তু এ বছর মাছের দেখা নেই। তাই ব্যবসা নিয়ে চরম শঙ্কায় আছি। মান্দা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান আকন্দ দেশি মাছ সঙ্কটের কথা স্বীকার করে বলেন, জমিতে মাত্রারিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, শুষ্ক মৌসুমে খাল-বিল, পুকুর ভরাট ও সেচে মাছ ধরার প্রবণতা, নির্বিচারে ছোট মাছ নিধনসহ নানা কারণে দেশি প্রজাতির মাছ বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে। এ বছর বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি নেই। এ কারণে বর্ষার ভরা মৌসুমেও বাজারে দেশি প্রজাতির মাছের আমদানী নেই।
চাষ বাড়লেও প্রাকৃতিক মাছের সংকট কেন
দেশে পাবদা, গুলশা, শিং, টেংরা ও কৈসহ বেশ কিছু দেশি প্রজাতির বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটও বিপন্ন ও কমে যাওয়া দেশি মাছের প্রজনন, পোনা উৎপাদন এবং চাষের প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত *দ্য ডেইলি স্টার*-এর এক প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউটের তথ্যের বরাতে বলা হয়, কয়েক দশকের গবেষণায় ৪১টি দেশি মাছের প্রজনন ও চাষপ্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে; এর মধ্যে ২০টি গত ১০ বছরে উন্নয়ন করা হয়েছে। <Cite refs={["turn340080search8"]}/>
দেশি মাছের চাষ সম্প্রসারণ বাজারে সরবরাহ বাড়াতে এবং চাষিদের আয় তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু শুধু পুকুরে উৎপাদন বাড়িয়ে প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংকট পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ, উন্মুক্ত জলাশয় বহু প্রজাতির মাছের প্রজনন, খাদ্য সংগ্রহ ও বেড়ে ওঠার আবাসস্থল। একই সঙ্গে এসব জলাশয় জলজ উদ্ভিদ, অণুজীব এবং অন্যান্য প্রাণীরও আবাস।
বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছের আবাসস্থল ও বহিরাগত প্রজাতির প্রভাব নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, পুকুরে চাষ করা কয়েকটি বিদেশি প্রজাতির মাছ দেশি মাছের প্রাচুর্য কমার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করতে পারে। গবেষকদের বিশ্লেষণে বাকি হ্রাসের বড় অংশের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আবাসস্থলের সংকোচন, অবক্ষয় ও ধ্বংসের কথা উঠে এসেছে। তবে এটি গবেষণার নির্দিষ্ট তথ্য ও বিশ্লেষণ; সব জলাশয় বা সব দেশি মাছের ক্ষেত্রে একই অনুপাত প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে, দেশি মাছ বিদেশে রপ্তানির বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বগুড়া ও জয়পুরহাট অঞ্চলে পাবদা, গুলশা, শিং ও টেংরার বাণিজ্যিক উৎপাদন এবং রপ্তানি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, উৎপাদিত মাছের একটি অংশ বিদেশে যায়, আর বাকি অংশ স্থানীয় বাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ রপ্তানি হচ্ছে বলেই দেশি মাছের প্রায় সব উৎপাদন বিদেশে চলে যায়—এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি নেই।
তবে স্থানীয় বাজারে দাম বেশি হওয়া, রপ্তানিকারকদের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহব্যবস্থার প্রভাব জানতে দেশি প্রজাতিভিত্তিক উৎপাদন, রপ্তানি, অভ্যন্তরীণ বিক্রি এবং বাজারদরের হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন। এসব তথ্য ছাড়া রপ্তানিকে এককভাবে দেশি মাছের সংকটের কারণ বলা ঠিক হবে না।
সংরক্ষণে প্রয়োজন জলাশয় রক্ষা ও কার্যকর নজরদারি
দেশি মাছ সংরক্ষণে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নদী, খাল, বিল, হাওর ও প্লাবনভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ ও সংযোগ রক্ষা। জলাশয় দখল ও ভরাট বন্ধ করা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ এবং নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে মা মাছ ও ছোট মাছের নির্বিচার আহরণ ঠেকাতে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়কে সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে।
শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এ কাজ সফল করা কঠিন। মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর বিকল্প আয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং নিষিদ্ধ মৌসুমে সহায়তা নিশ্চিত না হলে অনেক জেলে জীবিকার তাগিদে নিয়ম ভাঙতে পারেন। তাই সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে জেলেদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্ত করা জরুরি।
প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত করে অভয়াশ্রম গড়ে তোলা, পুরোনো জলাশয় পুনরুদ্ধার, ধানক্ষেতে ছোট মাছ চাষের উপযোগী ব্যবস্থা, দেশি মাছের পোনা উৎপাদন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মিশ্র চাষ সম্প্রসারণও সহায়ক হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে জলাশয়ের পরিবেশ, পানির গুণমান, মাছের প্রজাতি এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনার ওপর।
দেশে মাছের উৎপাদন বাড়ছে—এটি মৎস্য খাতের একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু উৎপাদনের হিসাবের পাশাপাশি কোন প্রজাতির মাছ কোথায় কমছে, কোন জলাশয়ে প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে কী ফল পাওয়া যাচ্ছে, তারও নিয়মিত হিসাব থাকা প্রয়োজন। কারণ, ‘ভাতে-মাছে বাঙালি’ পরিচয় শুধু বাজারে মাছের প্রাচুর্যের ওপর নির্ভর করে না; নদী-খাল-বিলের দেশি মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার ওপরও নির্ভরশীল।