কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপূজার মণ্ডপে পদদলিত হয়ে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আহত ২৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (সিট) গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে ভিড় নিয়ন্ত্রণে অবহেলার অভিযোগে আয়োজক ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশ।
রোববার দুপুর পর্যন্ত কলকাতা মেডিকেল কলেজের মর্গে নিহত ব্যক্তিদের ময়নাতদন্ত চলছিল। দুর্ঘটনার পর পূজামণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসন ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন শ্রীপর্ণা পোদ্দার (২৬), মিঠু মণ্ডল (৪৫), আকৃতি কুমারী (১৭), বর্ণালী হালদার (১৭), শুভম শঙ্কর (৩৩), আরতী সরকার বিশ্বাস (৪৫), টগর বেজ (৩৭), তানিয়া বিশ্বাস (১৮), কল্পনা জানা (৪৬), বিকাশ ভট্টাচার্য (৬৬), স্নেহা ভাণ্ডারী (২০), সন্দীপ বেজ (১৪), পিয়ালী প্রামাণিক (২৫), প্রিয়া সমাদ্দার (১৮), প্রাঞ্জল সরকার (১৩), দিলীপ ঘোষ (৫৯) ও দিপালী ঘোষ। দিলীপ ও দিপালী সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। এ ছাড়া বিহারের একই পরিবারের অভিষেক শ্রীবাস্তব (৩৮) ও আয়াংশ কুমার শ্রীবাস্তব (৭) নিহত হয়েছে।
দুর্ঘটনার জন্য পূজার আয়োজকদের দায়ী করছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, উদ্বোধনের পর থেকেই মণ্ডপে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও ভিড় নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং কয়েক মিটার পরপর দড়ি দিয়ে পথ আটকে দেওয়ায় মানুষের চাপ আরও বেড়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন এক বাসিন্দা।
ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা সরকারি পুলিশকর্মী, বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী ও ক্লাবের স্বেচ্ছাসেবকদের থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে দেখার পর সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে চোরবাগান ক্লাবের সম্পাদক ও সহসভাপতি, বাঁশের খুঁটি প্রস্তুতকারী, ভিআইপি পাস যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা একজন, ভিড় নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত ক্লাবের এক সদস্য এবং বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের দুই ইনচার্জ রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে এককালীন ২৫ লাখ রুপি করে আর্থিক সহায়তা এবং পরিবারের একজন সদস্যকে রাজ্য সরকারের গ্রুপ ডি পদে চাকরি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আহত ব্যক্তিদের পাঁচ লাখ রুপি করে সহায়তার পাশাপাশি চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় বহনের কথাও বলা হয়েছে।
ঘোষণার পর কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে ১৪ জনকে ইএম বাইপাসসংলগ্ন অ্যাপোলো হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। স্বাস্থ্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু জানান, তাঁদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি ১৩ জনের অবস্থা স্থিতিশীল। তবে আহতদের সরকারি হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের ঘটনায় কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে দুর্ঘটনার মধ্যেই শনিবার কলকাতায় যান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আহতদের দেখতে তিনি অ্যাপোলো হাসপাতালে যান। তবে দুর্ঘটনার পরও তাঁকে জাঁকজমকপূর্ণভাবে স্বাগত জানানোর ঘটনায় বিরোধী দলগুলো সমালোচনা করেছে। ঢাকের বোল ও লোকশিল্পীদের পরিবেশনার মাধ্যমে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস।
তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষ যখন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তখন অমিত শাহকে ঘিরে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন বৈপরীত্য তৈরি করেছে। দলটি প্রশ্ন তুলেছে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একই ধরনের তৎপরতা কেন দেখা যায়নি।
পুলিশের মোতায়েন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিরাপত্তার দিকে অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীভূত ছিল কি না, সে প্রশ্নও তুলেছে তৃণমূল। পাশাপাশি পূজার সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর এক ভাইপোর ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তুলে তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন করেছে দলটি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।