আধুনিক যুদ্ধ, ড্রোন হামলা ও বিমান আক্রমণের হুমকি মোকাবিলায় ৬০ হাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা করেছে ভারত সরকার। পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে দেশটির ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হবে। এতে পারমাণবিক, রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার তৎপরতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।
গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পের ঘোষণা দেয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে জম্মু-কাশ্মীর, পাঞ্জাব, রাজস্থান, গুজরাট, দিল্লিসহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এ কার্যক্রম চালানো হবে। প্রশিক্ষণে যুদ্ধের হুমকি সম্পর্কে সচেতনতা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং পারমাণবিক, রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত আগস্টে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বলেছিলেন, আগামী দিনে বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে। এরপর গত শুক্রবার পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পের ঘোষণা দেয়া হয়।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরীক্ষামূলক প্রকল্পটি প্রথম পর্যায়ে ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বাস্তবায়ন করা হবে। এগুলো হলো—জম্মু-কাশ্মীর, পাঞ্জাব, রাজস্থান, গুজরাট, দিল্লি, মেঘালয়, সিকিম, আসাম, উত্তর প্রদেশ, কেরালা, কর্ণাটক ও তামিলনাড়ু।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন দিনের একটি সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণে ৬০০ জন ‘সিভিল ডিফেন্স মাস্টার ট্রেইনার’ বা বেসামরিক প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। পরে তাদের প্রত্যেকে আরও ১০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেবেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্ধারিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে এসব প্রশিক্ষকের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পের ঘোষণায় একে ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরিচালনাগত দক্ষতা ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ককে একত্র করে সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ৬০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্বের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টি ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়নি। বরং যুদ্ধ ও অন্যান্য সংঘাতের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির ওপরই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পারমাণবিক, রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের হামলার ঝুঁকি সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।
প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর (পিআইবি) বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে ৫০ জনকে আগামী নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে প্রশিক্ষণের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—হুমকি সম্পর্কে সচেতনতা, সুরক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং যোগাযোগ ও সমন্বয়।
সরকারি ঘোষণায় সম্ভাব্য হুমকির ধরন হিসেবে আধুনিক ও ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ, ড্রোন সম্পর্কে সচেতনতা এবং বিমান হামলার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণে থাকবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা, অগ্নিনিরাপত্তা, রাসায়নিক, জীবাণু, তেজস্ক্রিয় ও পারমাণবিক (সিবিআরএন) ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা, হতাহতদের ব্যবস্থাপনা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম।
প্রশিক্ষণের শেষ পর্যায়ে জরুরি যোগাযোগ, সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সতর্কতা, ডিজিটাল ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা, সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় এবং ঘটনাস্থলে জরুরি কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘এই ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৬০ হাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা স্বেচ্ছাসেবকের কাছে বিশেষায়িত প্রস্তুতির দক্ষতা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। এতে উদ্যোগটির পরিধি ও কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।’
এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি বাড়াতে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে মহড়া আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছিল। সে সময় বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা শেষ পর্যন্ত কী ছিল, তা স্পষ্ট না হলেও কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে সরকার বেসামরিক নাগরিকদের ব্ল্যাকআউট চলাকালে ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দিয়েছিল।
ওই মহড়ায় স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ, বেসামরিক প্রতিরক্ষার ওয়ার্ডেন, হোম গার্ড, ন্যাশনাল ক্যাডেট কর্পস (এনসিসি), ন্যাশনাল সার্ভিস স্কিমের স্বেচ্ছাসেবক, নেহরু যুব কেন্দ্র সংগঠনের সদস্য এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যুক্ত হতে বলা হয়েছিল।
ভারতে ব্ল্যাকআউটসহ মহড়া এখন নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠছে। চলতি বছরের গ্রীষ্মে বিহার সরকারও এমন একটি মহড়ার আয়োজন করে। এতে পাটনা, কিশনগঞ্জ, বেগুসরাই, পূর্ণিয়া, আরারিয়া ও কাটিহার—এই ছয় জেলার কিছু এলাকায় মানুষকে বিদ্যুতের ব্যবহার বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল।
এর আগে ২০২৩ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সশস্ত্র বাহিনীকে সরকারের অর্জন প্রচারের নির্দেশ দিয়েছিল। প্রতিরক্ষা খাতে সরকারের ‘ভালো কাজগুলো তুলে ধরতে’ জনসমাগম হয় এমন স্থানে জিও-ট্যাগযুক্ত ৮২২টি ‘সেলফি পয়েন্ট’ তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, ‘মানুষ যেন এই উদ্যোগের অংশ হওয়ার অনুভূতি পায়।’
ভারতের নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশগুলোতে শান্তিকালীন সময়ে ব্ল্যাকআউট ও সামরিক ধাঁচের মহড়া সাধারণত হয় না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর এ ধরনের মহড়া বন্ধ হয়ে যায়। এ অঞ্চলে বেসামরিক প্রতিরক্ষার মূল লক্ষ্য সাধারণত যুদ্ধের প্রস্তুতির পরিবর্তে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি। ঝুঁকি কমানোর কাজে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নির্ভর করা হয়।
তবে নেপালের বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও ঝুঁকি কমানোর যৌথ মহড়া এবং পরিকল্পনায় অংশ নিতে দেখা যায়। শ্রীলঙ্কার বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনী বিমান হামলা বা অন্য ধরনের আক্রমণ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে মহড়া আয়োজন করে না।
সূত্র: দ্য ওয়্যার