জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে দলকে নতুন করে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে নেতৃত্ব। কেন্দ্রীয় কমিটিতে রদবদলের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের পরিকল্পনা করছে দলটি। একই সঙ্গে দল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের ফিরিয়ে আনারও আগ্রহ রয়েছে নেতৃত্বের। তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটকে কেন্দ্র করে পদত্যাগ করা নেতাদের সবাই যে ফিরতে আগ্রহী, তা নয়। তাঁদের কেউ কেউ বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার কাজে ব্যস্ত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এনসিপির অভ্যন্তরে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এর জেরে দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও তাজনূভা জাবীনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা পদত্যাগ করেন। তাঁদের আপত্তির কেন্দ্রে ছিল জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা থেকে এনসিপির সরে যাওয়ার আশঙ্কা।
নির্বাচনের পর পদত্যাগী নেতাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এনসিপির একাধিক নেতার বক্তব্যে আগ্রহের কথা উঠে এসেছে। তবে তাসনিম জারা, খালেদ সাইফুল্লাহ ও তাজনূভা জাবীন—এই তিন নেতার রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। তাজনূভা জাবীন স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন, তিনি এনসিপিতে ফিরতে চান না।
কমিটি পুনর্গঠন, তৃণমূলে নজর
সম্প্রতি এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। ২১৭ সদস্যের কমিটি কমিয়ে ১৯৬ সদস্যে আনা হয়েছে। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন তাঁদের পদে বহাল রয়েছেন। আগের কমিটির মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের মতো পদ বিলুপ্ত করে সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।
পুনর্গঠিত কমিটিতে কয়েকজন নেতার পদ ও দায়িত্বে পরিবর্তন এসেছে। সামান্তা শারমিন আগের কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থাকলেও নতুন কমিটিতে তাঁকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। তাঁকে দলের রাজনৈতিক পরিষদ থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। আরিফুল ইসলাম আদীবের পদেও পরিবর্তন এসেছে। আগের কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থাকা আদীবকে নতুন কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিষদে তাঁর অবস্থান বহাল রয়েছে। একইভাবে নাহিদা সারোয়ার নিভাকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব থেকে যুগ্ম সদস্যসচিব করা হয়েছে।
পদ পরিবর্তনের নির্দিষ্ট কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি এনসিপি। তবে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবেই এসব পরিবর্তন এসেছে বলে নেতাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আরিফুল ইসলাম আদীব পদাবনতির বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আগে সাংগঠনিক কাঠামো এক রকম ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতারা মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়কসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন ওই পদগুলো বিলুপ্ত হওয়ায় নতুন কাঠামোয় তাঁদের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সাংগঠনিক কাঠামোয় তিনি আগেও অষ্টম অবস্থানে ছিলেন, এখনো সেই অবস্থানেই আছেন।
কমিটি পুনর্গঠনের পাশাপাশি তৃণমূলের সংগঠন শক্তিশালী করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এনসিপি। দলটির নেতাদের মতে, নির্বাচনে অনেক প্রার্থী স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সাংগঠনিক ভিত্তি না থাকায় সমস্যায় পড়েছেন। এ অভিজ্ঞতা থেকে আসন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিতে চায় দলটি।
পদত্যাগীদের জন্য দরজা খোলা
দল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন এর আগে বলেছিলেন, পদত্যাগ করা নেতাদের কারও পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি। একসঙ্গে আন্দোলন ও সংগ্রাম করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের ফিরে আসার পথ খোলা রয়েছে। দলকে শক্তিশালী করার স্বার্থে কীভাবে তাঁদের ফিরিয়ে আনা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির এক শীর্ষ নেতাও পদত্যাগীদের ফেরানোর বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, দলকে শক্তিশালী করতে পুরোনো নেতাদের ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন কর্মী যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সবার জন্য এনসিপির দরজা খোলা। তাঁদের নিয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে চান তাঁরা। পদত্যাগী নেতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে আলোচনার সময় তাঁদের ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে।
তবে দলীয় নেতৃত্বের আগ্রহ আর পদত্যাগী নেতাদের সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য নিয়ে তাঁদের যে রাজনৈতিক আপত্তি ছিল, সেটি কতটা দূর হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
জাবীনের অবস্থান স্পষ্ট, জারার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি
এনসিপিতে ফেরার বিষয়ে তাজনূভা জাবীন স্পষ্টভাবে নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, তিনি বর্তমানে ‘অলটারনেটিভস’ নামের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। শিগগিরই সাংগঠনিক শক্তি প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য তাঁরা প্ল্যাটফর্মটি নিয়ে কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।
এনসিপি ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাবীন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তরুণেরা যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, এনসিপিকে দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিকাশ সম্ভব নয়। জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাধা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, তাসনিম জারা ও খালেদ সাইফুল্লাহর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাসনিম জারার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তবে জয়ী হননি। খালেদ সাইফুল্লাহও নির্বাচনে অংশ নেননি। তাঁদের কেউই এখন পর্যন্ত অন্য কোনো দলে যোগ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য থেকে জানা যায় না।
তাজনূভা জাবীন অবশ্য বিকল্প প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার কাজে মনোযোগী। ফলে এনসিপির আহ্বান সত্ত্বেও অন্তত তাঁর ফিরে আসার সম্ভাবনা আপাতত নেই বলেই তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট।
এনসিপির সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা, অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য নিয়ে তৈরি হওয়া মতপার্থক্য সামলানো। পদত্যাগী নেতাদের ফেরানোর উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান, দলের ভবিষ্যৎ কৌশল এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা তৈরি হয় কি না, তার ওপর।