- গোলের সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ; শেষ মুহূর্তে রুপনা চাকমার দুর্দান্ত সেভে রক্ষা
বাজল শেষ বাঁশি। ওসাকার নাগাই স্টেডিয়ামে ঋতুপর্ণা চাকমারা কিছুক্ষণ যেন মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। জয় নয়, গোলও নয়—মিয়ানমারের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেই এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের পথচলা শেষ হলো।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ‘এফ’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে এক পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। দুই দলই আগের দুই ম্যাচে বড় ব্যবধানে হেরেছিল। তাই শেষ ম্যাচে জয়ের লক্ষ্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত কেউই গোলের দেখা পায়নি। আক্রমণে মিয়ানমার তুলনামূলক এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের রক্ষণ ও গোলরক্ষক রুপনা চাকমার দৃঢ়তায় তারা কাঙ্ক্ষিত গোল পায়নি।
গত বছর মিয়ানমারের মাটিতে তাদের হারিয়েই প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন ঋতুপর্ণা চাকমা। তাঁর জোড়া গোলেই মিয়ানমারকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। দেড় বছর পর সেই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আবারও মাঠে নামলেও এবার জয়ের দেখা পেল না লাল-সবুজের দল।
এশিয়ান গেমসের এবারের আসরে বাংলাদেশের শুরুটা হয়েছিল উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ১০-০ গোলের হার দিয়ে। পরের ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হারতে হয় ৬-০ গোলে। মিয়ানমারও প্রথম দুই ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৫-০ এবং উত্তর কোরিয়ার কাছে ৮-০ গোলে হেরেছিল। ফলে দুই দলের কাছেই শেষ ম্যাচটি ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ।
ম্যাচের শুরুতেই গোলের সুযোগ তৈরি করে মিয়ানমার। প্রথম মিনিটেই তাদের আক্রমণ বাংলাদেশের রক্ষণে চাপ তৈরি করে। পরে আরও কয়েকটি সুযোগ আসে। ২৭ মিনিটে মিয়ানমারের একটি জোরালো শট গোলের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠলেও রুপনা চাকমা দৃঢ়তার সঙ্গে তা ঠেকিয়ে দেন। বাংলাদেশও পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। ঋতুপর্ণা, মনিকা চাকমা ও তহুরা খাতুনকে সামনে রেখে আক্রমণ সাজানোর চেষ্টা ছিল। তবে মিয়ানমারের দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ এবং মাঝমাঠে দ্রুত বল আদান-প্রদানে বাংলাদেশের রক্ষণকে বেশির ভাগ সময়ই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। ৩৮ মিনিটে বাংলাদেশের সামনে আসে ম্যাচের অন্যতম সেরা সুযোগ। মিয়ানমারের এক ডিফেন্ডারের ভুলে বক্সের সামনে বল পেয়ে যান ঋতুপর্ণা। দ্রুতগতিতে নেওয়া তাঁর শট অল্পের জন্য গোলবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। গোল না পেলেও ঋতুপর্ণাই বাংলাদেশের আক্রমণে সবচেয়ে বেশি হুমকি তৈরি করেন। প্রথমার্ধের শেষ দিকে একটি বাজে ট্যাকলের শিকার হন ঋতুপর্ণা। তবে চোটের শঙ্কা কাটিয়ে তিনি পুরো ম্যাচ খেলেছেন। বিরতির পর মিয়ানমার আরও চাপ বাড়ায়। বাংলাদেশকে মূলত রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হয়। ৭৭ মিনিটে রুপনা চাকমাকে একা পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হয় মিয়ানমার। এরপর ৮১ মিনিটে বাংলাদেশের গোলমুখে আবারও বিপজ্জনক আক্রমণ তৈরি হয়। শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের এক ডিফেন্ডার সময়মতো হস্তক্ষেপ করে গোলের সম্ভাবনা নষ্ট করেন। ৮৪ মিনিটে বাংলাদেশ একটি কর্নার আদায় করলেও সেটি থেকে কার্যকর কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। অধিনায়ক মারিয়া মান্দার নেওয়া কর্নারও কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দেয়নি। শেষ দিকে মিয়ানমারের চাপ আরও বাড়ে। ৮৬ মিনিটে তাদের আরেকটি আক্রমণ ব্যর্থ হয়। ৮৭ মিনিটে বাংলাদেশের ফাউল থেকে ফ্রি-কিক পায় মিয়ানমার, কিন্তু সেই সুযোগও কাজে লাগাতে পারেনি তারা।
যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে বাংলাদেশের গোলমুখে সবচেয়ে বড় বিপদ তৈরি হয়। মিয়ানমারের স্ট্রাইকার গোলবারের খুব কাছ থেকে শট নেন। কিন্তু আবারও বাংলাদেশের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান রুপনা চাকমা। তাঁর দুর্দান্ত সেভে গোলের নিশ্চিত সম্ভাবনা নষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত ৯০ মিনিট ও যোগ করা সময় মিলিয়ে গোলশূন্য ড্রতেই শেষ হয় ম্যাচ।
মিয়ানমার আক্রমণ ও শটের সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। অন্যদিকে বাংলাদেশও নিজেদের আক্রমণভাগ থেকে ধারাবাহিক চাপ তৈরি করতে পারেনি। ফলে জয় তো দূরের কথা, একটি গোলও করতে পারেনি লাল-সবুজের দল।
এই ড্রয়ে দুই দলই এক পয়েন্ট করে পেয়েছে। তবে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় গ্রুপের চতুর্থ দল হিসেবে এশিয়ান গেমস শেষ করেছে বাংলাদেশ। আগের আসর হাংজু এশিয়ান গেমসেও বাংলাদেশ জাপান ও ভিয়েতনামের কাছে হেরেছিল এবং নেপালের সঙ্গে ড্র করেছিল। এবারও একটি ড্র নিয়েই শেষ হলো বাংলাদেশের অভিযান।
তবে বড় ব্যবধানে দুই পরাজয়ের পর শেষ ম্যাচে গোল হজম না করে পয়েন্ট পাওয়া বাংলাদেশের জন্য অন্তত রক্ষণাত্মক দৃঢ়তার একটি দিক দেখিয়েছে। বিশেষ করে গোলরক্ষক রুপনা চাকমার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ বাংলাদেশকে পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছে।
এশিয়ান গেমস থেকে বিদায় নিলেও বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সামনে এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারের বিপক্ষে আগের সেই ঐতিহাসিক জয়ের স্মৃতি এবার জয় দিয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। গোলশূন্য ড্র দিয়েই শেষ হলো বাংলাদেশের এবারের এশিয়ান গেমস অভিযান।