মাঠে গড়ানোর পাঁচ দিনের মধ্যেই ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বাংলাদেশ ফুটবল লিগের (বিএফএল) সূচি নিয়ে তৈরি হলো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। একের পর এক ম্যাচ পেছানো, ক্লাবগুলোর আপত্তি, পাল্টাপাল্টি দাবি এবং শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলের পর শেষ পর্যন্ত লিগের দ্বিতীয় রাউন্ড এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাতীয় দলের ফিফা এশিয়ান কাপ মিশন শেষে আগামী ২ অক্টোবর থেকে আবার লিগের খেলা শুরু হবে।
১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছিল ২০২৬-২৭ মৌসুমের ঘরোয়া ফুটবল। কিন্তু মৌসুম শুরুর পরও লিগ ও ফেডারেশন কাপের সূচি নিয়ে বাফুফের অস্থিরতা কাটেনি। গত পাঁচ দিনে চারবার ফিকশ্চারে পরিবর্তন এসেছে। সর্বশেষ বুধবার সকালে মুন্সিগঞ্জে আবাহনী লিমিটেড ও চট্টগ্রাম সিটি এএফসির মধ্যকার ফেডারেশন কাপের ম্যাচও স্থগিত করা হয়। নতুন তারিখ তখনই জানানো হয়নি।
সূচি পরিবর্তনের শুরুটা হয় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে ঘিরে। জাতীয় দলের এশিয়ান কাপ মিশনের জন্য মোহামেডানের নয়জন খেলোয়াড় জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকায় ক্লাবটি তাদের প্রথম লিগ ও ফেডারেশন কাপের ম্যাচ পেছানোর আবেদন করে। বাফুফে সেই আবেদন গ্রহণ করে মোহামেডানের ২৫ সেপ্টেম্বরের লিগ ম্যাচ ২ অক্টোবর এবং ২৯ সেপ্টেম্বরের ফেডারেশন কাপের ম্যাচ ৬ অক্টোবর নির্ধারণ করে।
এরপরই আপত্তি তোলে অন্য ক্লাবগুলো। আবাহনী ও ব্রাদার্স ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, জাতীয় দলের খেলোয়াড় না থাকার কারণে মোহামেডানের ম্যাচ পিছিয়ে দেওয়া হলে একই ধরনের সমস্যায় থাকা অন্য ক্লাবগুলোর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে কি না।
আবাহনীর দাবি ছিল, তাদেরও কয়েকজন খেলোয়াড় জাতীয় দলের প্রস্তুতি ক্যাম্পে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন পরে চোটে পড়েছেন। ফলে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতিতে ফেডারেশন কাপ ও লিগের ম্যাচ খেলা নিয়ে সমস্যার কথা জানিয়ে ম্যাচ পেছানোর আবেদন করে ক্লাবটি। ব্রাদার্স ইউনিয়নও বাফুফের সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় ২২ সেপ্টেম্বর। ফেডারেশন কাপের সূচি অনুযায়ী সেদিন আবাহনী-চট্টগ্রাম সিটি এবং রহমতগঞ্জ-ব্রাদার্স ইউনিয়নের ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুই ম্যাচই এক দিন পিছিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর করার সিদ্ধান্ত নেয় বাফুফে। সেদিন শুধু ফর্টিস এফসি ও ফকিরেরপুল ইয়ং মেনস ক্লাবের ম্যাচটি নির্ধারিত সময়েই মাঠে গড়ায়, যা ১-১ গোলে শেষ হয়।
কিন্তু আবাহনী বুধবারও মাঠে নামতে রাজি হয়নি। ক্লাবটির আপত্তি ছিল, এক দিন পিছিয়ে দিলেও মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। আবাহনী চেয়েছিল তাদের লিগ ম্যাচের সূচিও এমনভাবে করা হোক, যাতে মোহামেডান প্রথম ম্যাচ খেলার আগে তারা দ্বিতীয় ম্যাচ না খেলে। কারণ ১৩ দলের লিগে প্রতি রাউন্ডে একটি দল বিরতিতে থাকে। প্রথম রাউন্ডে সেই বিরতিতে ছিল মোহামেডান। ফলে মোহামেডান তখনও লিগে মাঠে নামেনি, অথচ অন্য দলগুলো পরবর্তী রাউন্ডে চলে গেলে সূচিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এ অবস্থায় বুধবার সকালে আবাহনী-চট্টগ্রাম সিটি ম্যাচটি আবারও স্থগিত করা হয়। বাফুফে পরে জানায়, ম্যাচটির নতুন দিন নির্ধারণ করা হবে। একই সময় লিগের দ্বিতীয় রাউন্ডও এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। বাফুফের প্রফেশনাল লিগ ম্যানেজমেন্ট কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, সব দলের সুবিধা বিবেচনা করেই লিগের ফিকশ্চার ‘বডিলি শিফট’ করা হয়েছে। ২ অক্টোবর থেকে লিগ আবার শুরু হবে।
তবে ফেডারেশন কাপের সব ম্যাচ একইভাবে পিছিয়ে দেওয়া হয়নি। বাফুফের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আবাহনীর বুধবারের ম্যাচটি শুক্রবার আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, আর ফেডারেশন কাপের বাকি ম্যাচগুলো আগের সূচি অনুযায়ী চলবে।
সূচি নিয়ে এই টানাপোড়েন অবশ্য মৌসুম শুরুর আগেই শুরু হয়েছিল। ২০২৬-২৭ মৌসুমের ঘরোয়া ফুটবল প্রথমে ২৫ আগস্ট শুরু হওয়ার কথা ছিল। পরে খেলোয়াড় নিবন্ধন এবং কয়েকটি ক্লাবের ফিফা নিবন্ধন নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত জটিলতায় মৌসুম শুরুর তারিখ পিছিয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর করা হয়। একই সঙ্গে ফেডারেশন কাপের সূচিও পরিবর্তন করা হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচি। বাংলাদেশ সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ফিফা এশিয়ান কাপসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মিশনে থাকবে। বাফুফে শুরুতে আন্তর্জাতিক উইন্ডোর মধ্যেও ঘরোয়া ম্যাচ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর ফলে জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকা খেলোয়াড়দের নিয়ে ক্লাবগুলোর সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং সেখান থেকেই সূচি নিয়ে নতুন বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।
ক্লাবগুলোর আপত্তির কেন্দ্রে ছিল মূলত ‘সমতার’ প্রশ্ন। একটি ক্লাব জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতির কারণে ম্যাচ পেছানোর সুবিধা পেলে অন্য ক্লাবগুলোও একই সুবিধা চাইবে—এমন দাবি ওঠে। ফলে একটি ম্যাচ পেছানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে একাধিক ম্যাচের ওপর। এরপর একটি ম্যাচের নতুন তারিখ ঠিক করতে গিয়ে আরেকটি ম্যাচের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত পুরো লিগের দ্বিতীয় রাউন্ডই পিছিয়ে দিতে হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক সূচি ও ঘরোয়া লিগের ক্যালেন্ডারের মধ্যে পর্যাপ্ত সমন্বয় ছিল কি না। মৌসুম শুরুর আগেই বাফুফে জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক উইন্ডোর সময়ও ঘরোয়া প্রতিযোগিতা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু জাতীয় দলের জন্য একাধিক ক্লাবের খেলোয়াড় একসঙ্গে না পাওয়া গেলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে শুরু থেকেই সংশয় ছিল।
এর ওপর সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যস্ততা। ফর্টিস এফসির এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের ম্যাচের কারণে তাদের ঘরোয়া সূচিতেও আলাদা সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে। এরপর নভেম্বরে বাংলাদেশের মাটিতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের সূচিও রয়েছে। অর্থাৎ চলতি মৌসুমে ঘরোয়া ফুটবলের ক্যালেন্ডারে আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও ক্লাবের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রভাব থাকছেই।
ফলে ২ অক্টোবর থেকে লিগ ফের শুরু হলেও সূচি-জটিলতার এখানেই শেষ হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একটি স্থিতিশীল ক্যালেন্ডার তৈরি করতে হলে জাতীয় দলের ম্যাচ, ক্লাবের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, খেলোয়াড় নিবন্ধন এবং ১৩ দলের লিগ কাঠামো—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
মৌসুমের শুরুতেই বারবার সূচি পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সমর্থকেরা। একটি ম্যাচের প্রস্তুতি নিয়ে দলকে আবার নতুন তারিখের জন্য প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। ভেন্যু, ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা ও খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
অন্যদিকে দর্শকদের জন্যও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। কখন কোন ম্যাচ হবে, কোন মাঠে হবে—শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলে মাঠে দর্শক উপস্থিতি এবং ঘরোয়া ফুটবলের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘরোয়া ফুটবলের মৌসুম শুরুর আগেই বাফুফে সূচি নিয়ে একাধিকবার সমস্যায় পড়েছে। এবার মাঠে খেলা শুরু হওয়ার পর পাঁচ দিনের মধ্যে চারবার পরিবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত লিগের দ্বিতীয় রাউন্ড পিছিয়ে দেওয়ার ঘটনা সেই সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করেছে। এখন ২ অক্টোবর থেকে নতুন সূচিতে লিগ কতটা ধারাবাহিকভাবে চালানো যায়, সেটিই হবে বাফুফের জন্য পরবর্তী বড় পরীক্ষা।