এশীয় ক্লাব ফুটবলে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের নতুন সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশের ফর্টিস এফসি। প্রথমবার অংশ নিয়েই এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়া দলটির সামনে এবার লক্ষ্য গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা। কঠিন প্রতিপক্ষ, অপরিচিত পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতার ঘাটতি—সব চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়েই কুয়েতের উদ্দেশে যাত্রা করছে দলটি।
এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের ২০২৬–২৭ মৌসুমের পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের ‘সি’ গ্রুপে খেলবে ফর্টিস। তাদের প্রতিপক্ষ ভারতের এফসি গোয়া, স্বাগতিক কুয়েতের আল-কাদসিয়া এসসি এবং তাজিকিস্তানের রেগার-তাদাজ। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে কুয়েত সিটিতে। সূচি অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর আল-কাদসিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে অভিযান শুরু করবে ফর্টিস। ২০ অক্টোবর দ্বিতীয় ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ এফসি গোয়া। ২৩ অক্টোবর গ্রুপের শেষ ম্যাচে খেলবে রেগার-তাদাজের বিপক্ষে।
প্রথমবার এশীয় ক্লাব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েই মূল পর্বে ওঠা ফর্টিসের জন্য বড় অর্জন। গত ১১ আগস্ট ঢাকায় প্রিলিমিনারি পর্বে কিরগিজস্তানের মুরাস ইউনাইটেডকে ১–০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ পর্ব নিশ্চিত করে দলটি। ম্যাচের ৫২ মিনিটে মোহাম্মদ ইব্রাহিমের করা গোলেই আসে জয়। গাম্বিয়ান ফরোয়ার্ড পা ওমর বাবুর পাস থেকে গোলটি করেন তিনি। ওই জয়ের মধ্য দিয়ে এশীয় ক্লাব ফুটবলে নিজেদের প্রথম অভিযানেই মূল পর্বে পৌঁছে যায় ফর্টিস।
এবারের চ্যালেঞ্জ অবশ্য আরও কঠিন। প্রিলিমিনারি পর্বে একটি ম্যাচ জিতেই মূল পর্বে ওঠার সুযোগ ছিল; কিন্তু গ্রুপ পর্বে তিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ধারাবাহিক ভালো ফল করতে হবে। পশ্চিম এশিয়ার তিন গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন এবং সেরা রানার্সআপ দল কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবে। পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের গ্রুপগুলো থেকেও চারটি দল শেষ আটে জায়গা পাবে। ফলে একটি ম্যাচে হোঁচট খেলেই ফর্টিসের নকআউটের স্বপ্ন জটিল হয়ে উঠতে পারে।
দেশ ছাড়ার আগে দলের প্রধান কোচ মাসুদ পারভেজ কায়সার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, লক্ষ্য বড় হলেও প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে তাঁরা সচেতন। সব প্রতিপক্ষই ফর্টিসের তুলনায় এগিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু কোনো দলই অপরাজেয় নয়—এমন বিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামতে চায় দল।
কোচের কাছে প্রথম দুটি ম্যাচ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আল-কাদসিয়া স্বাগতিক হওয়ায় মাঠ ও আবহাওয়ার সঙ্গে পরিচিতির সুবিধা পাবে। অন্যদিকে, এফসি গোয়া ভারতীয় ফুটবলের পরিচিত শক্তি। এই দুই ম্যাচে পয়েন্ট অর্জন করতে পারলে শেষ ম্যাচের আগে নকআউটের লড়াইয়ে টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়বে। রেগার-তাদাজের বিপক্ষে শেষ ম্যাচের আগে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়তে চান না কায়সার।
তিন প্রতিপক্ষের মধ্যে আল-কাদসিয়ার ঘরের মাঠে খেলার সুবিধা থাকবে। কুয়েতের আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাগতিকদের বাড়তি সুবিধা থাকতে পারে। এফসি গোয়ার বিপক্ষে ফর্টিসকে মোকাবিলা করতে হবে ভারতের ক্লাব ফুটবলের অভিজ্ঞতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক খেলার ধরন। আর রেগার-তাদাজের শক্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন কায়সার। তাজিকিস্তানের ক্লাবটি ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় ভালো ছন্দে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ঘরোয়া লিগে ফর্টিসের শুরুটাও আশাব্যঞ্জক। নতুন মৌসুমের প্রথম তিন ম্যাচে দুটি জয় ও একটি ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছে দলটি। এই সময় ১৫ গোল করার কথা জানিয়েছে ক্লাব-সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে ঘরোয়া লিগের ফলাফল দিয়ে এশীয় প্রতিযোগিতায় সাফল্য নিশ্চিত ধরে নিতে রাজি নন কোচ। তাঁর মতে, শুরুর ম্যাচগুলো দলকে আক্রমণ সাজানো, খেলার ধরন ঠিক করা এবং রক্ষণ সামলানোর অনুশীলন দিয়েছে। কিন্তু মহাদেশীয় পর্যায়ে আরও উন্নত ফুটবল খেলতে হবে।
ফর্টিসের সাম্প্রতিক ঘরোয়া ম্যাচে ব্রাদার্স ইউনিয়নকে ৬–০ গোলে হারানোর ফলও দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের চাপ, গতি ও কৌশল ভিন্ন হবে। তাই শুধু গোলের ব্যবধান নয়, বল দখল, রক্ষণে শৃঙ্খলা, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতাই কুয়েতে দলের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলের জন্যও ফর্টিসের এই অভিযান তাৎপর্যপূর্ণ। এশীয় প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে আবাহনী লিমিটেডের ২০১৯ সালে এএফসি কাপে ইন্টার-জোন প্লে-অফের সেমিফাইনালে ওঠার কথা বলা হয়। ফর্টিস এবার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারলে দেশের ক্লাব ফুটবলের আন্তর্জাতিক অগ্রযাত্রায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে।
তবে লক্ষ্য অর্জনের পথ সহজ নয়। গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচে পয়েন্টের গুরুত্ব থাকবে, আর প্রথম ম্যাচেই স্বাগতিক আল-কাদসিয়ার মুখোমুখি হওয়ায় ফর্টিসকে শুরু থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। কুয়েতের পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া, রক্ষণে ভুল কমানো এবং আক্রমণে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগানোই হবে তাদের প্রধান কাজ।
প্রথমবার এশীয় ক্লাব প্রতিযোগিতায় নেমেই মূল পর্বে ওঠার পর ফর্টিসের সামনে এখন নিজেদের পরবর্তী ধাপ প্রমাণের সুযোগ। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে কি না, তার অনেকটাই নির্ভর করবে গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচের ফলের ওপর। দেশের ফুটবলপ্রেমীরা এখন তাকিয়ে থাকবেন কুয়েতে ফর্টিসের পারফরম্যান্সের দিকে।