দুর্বল বা সংকটাপন্ন ব্যাংকের সাবেক মালিকদের পুনরায় সেই ব্যাংকের মালিকানা, শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের সুযোগ দেওয়ার বিতর্কিত বিধান বাতিল করতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশনে বিলটি পরীক্ষা করে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে গত এপ্রিল মাসে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’-এর ১৮(ক) ধারা পুরোপুরি বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমান আইনের ১৮(ক) ধারায় কোনো ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে ওই ব্যাংকের শেয়ারধারক ছিলেন—এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী সময়ে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে সাবেক শেয়ারধারকদের বাইরে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেও এ ধরনের সুযোগ দিতে পারত।
নতুন সংশোধনী বিল পাস হলে এই সুযোগ আর থাকবে না। অর্থাৎ, কোনো ব্যাংককে রেজল্যুশনের আওতায় নেওয়ার পর তার সাবেক মালিক বা শেয়ারধারকেরা আগের মালিকানা বা ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরায় গ্রহণের জন্য ওই বিশেষ ধারার ভিত্তিতে আবেদন করার সুযোগ হারাবেন।
ব্যাংক রেজল্যুশন আইন মূলত কোনো ব্যাংক গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়লে আমানতকারী ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে সেই ব্যাংককে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ, সম্পদ ও দায় স্থানান্তর অথবা প্রয়োজনীয় অন্য ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি কাঠামো তৈরি করে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশে ১৮(ক) ধারা ছিল না। পরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাদেশটি সংশোধন করে আইনি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় নেয় এবং তখনই ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়।
সাবেক মালিক ও পরিচালকদের সংকটাপন্ন ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়টি সামনে আসার পর অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে সমালোচনা তৈরি হয়। বিশেষ করে যেসব ব্যাংক আর্থিক দুর্বলতা, অনিয়ম বা সুশাসনের ঘাটতির কারণে রেজল্যুশনের আওতায় আসতে পারে, সেসব ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের পুনরায় মালিকানা পাওয়ার সুযোগ রাখা কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরবর্তীতে সরকার ওই বিধান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা বিলুপ্ত করতে সংশোধনী বিলটি সংসদে আনা হলো।
বিলটির উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আইনটি কার্যকর হওয়ার পর ১৮(ক) ধারায় নির্ধারিত পূর্ণ শর্ত পরিপালন করে ইতিমধ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি। এ কারণে ধারাটি বিলুপ্ত করা সমীচীন বলে সরকার মনে করছে।
এদিকে ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় রেজল্যুশন কাঠামো নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
এই পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণসহ সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় রেজল্যুশন আইন গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ফলে সংশোধনী বিলটি শুধু একটি নির্দিষ্ট ধারা বাতিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যাংক সংকট মোকাবিলায় নতুন কাঠামোর অধীনে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটিও এর সঙ্গে যুক্ত।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনা ও প্রতিবেদন দেওয়ার পর বিলটি সংসদের পরবর্তী আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার দিকে যাবে। বিলটি পাস হলে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা আর কার্যকর থাকবে না।