নীলক্ষেতখ্যাত রংপুর নগরীর শহীদ জররেজ মার্কেটে পুরোনো বইয়ের কেনাবেচায় মন্দা দেখা দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে পুরোনো বইয়ের সরবরাহ কমেছে, কমেছে ক্রেতার সংখ্যাও। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাসের পরিবর্তন, পাঠ্যবইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ সহজলভ্য হওয়া এবং অনলাইনে বই কেনাবেচার প্রসারের কারণে আগের মতো আর বিক্রি হচ্ছে না। এর পাশাপাশি বই ভাড়ায় দেওয়ার জন্য পরিচিত ‘বইদাদু’ ওমর শরীফের মৃত্যুর প্রভাবও পড়েছে বাজারে। সাধারণ পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও সাহিত্যের বইয়ের কেনাবেচাও কমেছে।
রংপুর সিটি করপোরেশন ভবনের বিপরীতে অবস্থিত শহীদ জররেজ মার্কেটের ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে পুরোনো বইয়ের ব্যবসায় মন্দার এমন চিত্র পাওয়া গেছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি লেখকদের নানা ধরনের বই পাওয়া যায় এই মার্কেটে। দর-কষাকষির সুযোগ থাকায় তুলনামূলক কম দামে প্রয়োজনীয় বই কেনা যায় বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।
জানা যায়, ১৯৮৫ সাল থেকে শহীদ জররেজ মার্কেটে কম দামে পুরোনো বইয়ের ব্যবসা শুরু হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ইয়াকুব মাহফুজ আলী ওরফে জররেজের নামানুসারে মার্কেটটির নামকরণ করা হয়েছে। বর্তমানে মার্কেটের ৬৮টি দোকানের মধ্যে ২৯টিতে বই বিক্রি হয়। প্রবেশপথের দুই পাশ থেকে শুরু করে ভেতরের ছোট ছোট দোকানে সাজানো রয়েছে নানা ধরনের বই। নতুন মলাট বা নতুন বইয়ের ঘ্রাণ না থাকলেও এখানে পাওয়া যায় প্রয়োজনীয় অনেক বই। তবে আগের তুলনায় ক্রেতাদের উপস্থিতি কম। অনেক দোকানিকে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকতে দেখা যায়।

মার্কেটের ভাই ভাই বুক স্টোরের কর্মচারী আনাস বলেন, নতুন বই কিনতে গেলে অনেক বেশি টাকা খরচ হয়। অথচ একই বই এখানে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কাছে মার্কেটটি বেশ নির্ভরযোগ্য। তবে আগের মতো পুরোনো বইয়ের কেনাবেচা নেই। এখনো বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রয়োজনীয় বই খুঁজতে আসেন। চাকরিপ্রত্যাশীরাও তাঁদের প্রস্তুতির জন্য বই কেনেন। পছন্দের বই পেলে অনেকেই কেনার আগে পাতা উল্টে দেখে নেন।
নার্সিংয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, অনেক সময় হাতে বেশি টাকা থাকে না। অথচ পড়াশোনার জন্য বই প্রয়োজন হয়। তখন পুরোনো বইয়ের মার্কেটে আসতে হয়। এতে খরচ কমে, আবার প্রয়োজনীয় বইও পাওয়া যায়।
মার্কেটের সামনে অবস্থিত কমদামি বই মেলা দোকানে কথা হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিপন শাহরিয়ারের সঙ্গে। বিতর্ক ও সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী এই শিক্ষার্থী বলেন, দোকানটিতে বইদাদু নামে পরিচিত ওমর শরীফ বসতেন। তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও নাটকের বই ভাড়ায় নিয়ে পড়তেন তিনি। সামান্য টাকায় বই ভাড়া দিয়ে ওমর শরীফ জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন। বছরখানেক আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এরপর আগের মতো বই ভাড়া নিতে আর মার্কেটে আসা হয় না।
রাশেদ বই ঘরের স্বত্বাধিকারী রশিদুল ইসলাম বলেন, এক দশক আগেও এই মার্কেটের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো ছিল শিক্ষার্থীদের কম দামে বই সংগ্রহের অন্যতম জায়গা। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা নতুন বইয়ের পরিবর্তে কম দামে পুরোনো বই কিনে পড়াশোনার খরচ কমানোর চেষ্টা করতেন। বইপ্রেমীদের কাছেও এসব দোকান ছিল পছন্দের লেখকের পুরোনো ও দুর্লভ বই খুঁজে পাওয়ার ঠিকানা। কিন্তু এখন শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ পাঠকদের আনাগোনাও কমেছে।
প্রায় ২৫ বছর ধরে পুরোনো বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ ব্যবসায়ী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, পুরোনো বই কেনার প্রতি মানুষের আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। আগে অনেক শিক্ষার্থী পুরোনো গাইড বই দিয়েই পড়াশোনার কাজ চালিয়ে নিতেন। বর্তমানে তাঁরা পুরোনো বইয়ের পরিবর্তে নতুন বই কিনতে বেশি আগ্রহী।
কমদামি বই মেলার স্বত্বাধিকারী আল আমিন রাজা বলেন, বিক্রি কমার পাশাপাশি পুরোনো বই সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। আগে অনেক শিক্ষার্থী পুরোনো বই বিক্রি করে নতুন বই কিনতেন। এতে একই বই একাধিক শিক্ষার্থীর কাজে লাগত। এখন পুরোনো বই সংগ্রহ এবং নিয়মিত ক্রেতা পাওয়া—দুটিই ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ফেরিওয়ালারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরোনো বই সংগ্রহ করেন। পরে তাঁদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় বই কিনে নেন ব্যবসায়ীরা। অনেক সময় যিনি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বই বিক্রি করেন, তিনিই আবার প্রয়োজনীয় পুরোনো বই কিনতে দোকানে আসেন। তবে বর্তমানে বাজারে ক্রেতাদের আনাগোনা যেকোনো সময়ের তুলনায় কম।
আল আমিন রাজা আরও বলেন, অনলাইনে বই কেনাবেচার প্রসার এবং পাঠ্যবইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ সহজলভ্য হওয়ায় পুরোনো বইয়ের বিক্রি কমেছে। বিভিন্ন অনলাইন বুকশপ ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ঘরে বসেই পাঠ্যবই, রেফারেন্স বই, গল্প, উপন্যাস ও চাকরির প্রস্তুতির বই অর্ডার করা যাচ্ছে। ফলে বই কিনতে আগের মতো সরাসরি দোকানে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে। পাশাপাশি মানুষের পাঠাভ্যাস কমে যাওয়াও পুরোনো বইয়ের বাজারে ক্রেতা হ্রাসের অন্যতম কারণ।
রংপুর বিভাগীয় লেখক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কবি ও সাহিত্যিক জাকির আহমদ বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে রংপুরের পুরোনো বইয়ের ব্যবসা কতটা টিকে থাকতে পারবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ ফিরিয়ে আনা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পুরোনো বইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারলে এই বাজার আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
শহীদ জররেজ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়ছে। আগের মতো ভালো ব্যবসা হচ্ছে না। বিশেষ করে পুরোনো বইয়ের ব্যবসায় মন্দা পরিস্থিতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক ব্যবসায়ী হতাশ ও ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো রকমে টিকে আছেন।