যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা কতটা?

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত নতুন করে বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এই সংঘাত কি শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে বিশ্বকে ঠেলে দিতে পারে?

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতটি এখন আর কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, লেবানন ও ফিলিস্তিনসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন অস্থির পরিস্থিতির মুখোমুখি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার পর সংঘাতের সূচনা হয়। জুনে স্বল্প সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা জোরদার করে। জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

একই সময়ে গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইরানপন্থী সংগঠন হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিদের সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি বহুমাত্রিক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। তবে এটিকে এখনই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলা যাবে না। কারণ, রাশিয়া ও চীন এখনও সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। তারা ইরানকে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সীমিত সামরিক সহায়তা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাতে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা বড় ধরনের সামরিক দুর্ঘটনা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ রূপ দিতে পারে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বড় হামলা বা মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে সৌদি আরব ও পাকিস্তানও সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইয়েমেনে সংঘাতের জেরে যদি হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে রিয়াদ সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির কারণে পাকিস্তানও প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা নিতে বাধ্য হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ঘোষণা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ইতোমধ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট সীমিত বা স্থগিত করেছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে পড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক মার্গারেট ম্যাকমিলান মনে করেন, ইতিহাসে অনেক বড় যুদ্ধই পরিকল্পনার চেয়ে ভুল হিসাব ও ভুল বোঝাবুঝির কারণে শুরু হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ছোট একটি ঘটনাও কখনও কখনও জোটগত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটও তেমন এক সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। যদিও কোনো পক্ষ প্রকাশ্যে বৈশ্বিক যুদ্ধ চায় না, তবুও ধারাবাহিক হামলা, পাল্টা হামলা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

তাদের মতে, সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা না গেলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক শান্তির জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত