মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র সংঘাত ও সদস্যদেশগুলোর ভূরাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও যৌথ ঘোষণাপত্রে ঐকমত্যে পৌঁছেছে উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকস। চার দিনের বেশি সময় ধরে চলা টানাপোড়েন ও রাতভর আলোচনার পর শনিবার নয়াদিল্লিতে ঘোষণাপত্রের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছান জোটের সদস্যদেশগুলোর প্রতিনিধিরা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানগত দূরত্বের কারণে আলোচনা কঠিন হয়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে ব্রিকস।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লি শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত যৌথ ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন যেকোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বিরোধ মেটাতে সংলাপ, পরামর্শ ও কূটনীতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার শুরু হওয়া ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বাগত ভাষণে জোটের ঐক্যকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর অধিক প্রতিনিধিত্ব এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে ঘিরে সদস্যদেশগুলোর ভিন্ন অবস্থান। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই জোটে থাকলেও আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয়ে তাদের অবস্থানে তীব্র পার্থক্য রয়েছে। সম্মেলনের আগে ব্রিকসের জ্যেষ্ঠ আলোচক বা শেরপারা ঘোষণাপত্রের ভাষা নিয়ে কয়েক দিন ধরে আলোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত ‘উসকানিবিহীন আগ্রাসনের’ সব ধরনের নিন্দা এবং সংঘাত প্রশমনের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়।
এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে ইরান ও আমিরাতের মতপার্থক্যের কারণে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার পর এবার শীর্ষ সম্মেলনের আগে একই ধরনের অচলাবস্থা কাটাতে ভারত সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনের আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনায় পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময়ের পাশাপাশি সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের ওপর ভারতের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন মোদি। তিনি নৌ চলাচল ও বাণিজ্যের স্বাধীনতা এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন।
নয়াদিল্লির সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ সদস্যদেশগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবারের সম্মেলনে সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও ব্রাজিল জোটের সদস্য হিসেবে রয়েছে।
সম্মেলনে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আরও ন্যায়সংগত ও সমতাভিত্তিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি বলেন, বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ওপর, অথচ বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনও পর্যাপ্ত নয়।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে ভারত। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর ব্রিকসের আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়েও যৌথ অবস্থান নিয়েছে ব্রিকস। ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একতরফা শুল্ক ও অশুল্ক ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে জোটটি।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ঘিরে ইরান ও আমিরাতের মতো ভিন্ন অবস্থানের দেশগুলোকে একই ঘোষণাপত্রে আনতে পারা ব্রিকসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। তবে একই সঙ্গে জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ঘোষণাপত্রে ঐকমত্য ব্রিকসের রাজনৈতিক সংহতির চূড়ান্ত প্রমাণ কি না, নাকি নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সীমিত সমঝোতা—তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সদস্যদেশগুলোর সমন্বয়ের ওপর।
ব্রিকসের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ‘ট্রইকা’ ব্যবস্থা চান মোদি
ব্রিকসের সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ‘ট্রইকা’ ব্যবস্থা এবং একটি নিরাপদ ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শনিবার নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রতি বছর সভাপতিত্ব বদলালেও এতে জোটটির প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের গতি যেন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর অনুসরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ২০২৬ সালে ভারতের সভাপতিত্বে আয়োজিত সম্মেলনে মোদি বলেন, আগামী ২০ বছরের জন্য ব্রিকসকে নতুন ও উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি নিয়ে এগোতে হবে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালীতেও পরিবর্তন আনা জরুরি।
এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই) বলছে, প্রস্তাবিত ‘ট্রইকা’ ব্যবস্থায় আগের, বর্তমান ও পরবর্তী সভাপতিত্বকারী দেশগুলোর সমন্বয়ে কাজ করবে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যোগ ও সিদ্ধান্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি একটি নিরাপদ ডিজিটাল তথ্যভান্ডারে প্রতিটি সিদ্ধান্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং অগ্রগতির তথ্য সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছেন মোদি। বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার আর বিলম্ব না করার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভোটাধিকার ও নেতৃত্বের কাঠামোকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানান।
মোদি বলেন, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথ এখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে রয়েছে। এ বৈষম্য দূর করতে প্রতিনিধিত্ব, কার্যকর সাড়া প্রদান এবং নিয়ম প্রণয়ন—এই তিন ভিত্তির ওপর একটি ১০ দফা সংস্কার রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি। আগামী সম্মেলনে এটি চূড়ান্ত করার আহ্বান জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী।