বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নয়া দিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে শনিবার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন দুই নেতা।
২০২০ সালে হিমালয়ের লাদাখ সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর চীন ও ভারতের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। সেই উত্তেজনা কাটিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শি ও মোদীর সর্বশেষ বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সীমান্ত পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, দুই নেতা বাণিজ্য, সড়ক যোগাযোগ ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সাংস্কৃতিক বিনিময়, ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মানুষের চলাচল আরও সহজ করার বিষয়েও তাঁরা আলোচনা করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয় দেশের উদ্বেগের বিষয়গুলো সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন শি ও মোদী। এর মধ্যে রয়েছে কাঠামোগত বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, সরবরাহ শৃঙ্খল-সংক্রান্ত সমস্যা এবং বাজারে অর্থবহ ও পূর্বাভাসযোগ্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
চীন বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চীনের শুল্ক-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রেকর্ড ১৫ হাজার ৫৬০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
তবে দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। চীন থেকে ভারতের আমদানি বিপুল হলেও দেশটিতে ভারতের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম। ফলে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
নয়া দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে এই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি ভারতীয় পণ্যের জন্য চীনের বাজারে আরও সুযোগ তৈরির দাবি জানিয়ে আসছে। একই সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খল ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের ক্ষেত্রে পূর্বাভাসযোগ্যতা নিশ্চিত করাও ভারতের অন্যতম অগ্রাধিকার।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শি জিনপিং বৈঠকে জানান, চীন সবসময় চীন-ভারত সম্পর্ককে কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে এসেছে এবং সে অনুযায়ী সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়েছে।
শি বলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে, সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ছে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
চীন ও ভারতের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় স্পর্শকাতর বিষয় সীমান্ত। দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তের বড় একটি অংশ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে এবং বেশির ভাগ জায়গায় সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু রক্তক্ষয়ী সীমান্ত যুদ্ধ হয়েছিল। এরপর কয়েক দশক ধরে সীমান্তে নানা সময়ে উত্তেজনা তৈরি হলেও বড় ধরনের সংঘাত এড়িয়ে চলেছিল দুই দেশ।
তবে ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি ঘটে। ওই ঘটনায় ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হন। চীনের পক্ষ থেকেও চার সেনা নিহত হওয়ার কথা পরে জানানো হয়। ওই সংঘাতের পর দুই দেশের সীমান্তে বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয় এবং কূটনৈতিক সম্পর্কেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
দীর্ঘ কয়েক দফা সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার পর ২০২৪ সালে দুই দেশ পশ্চিম হিমালয়ের সীমান্তে সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান কমানোর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়। এরপর ধীরে ধীরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ জোরদার হয়।
সর্বশেষ শি-মোদী বৈঠক সেই প্রক্রিয়াকেই আরও এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সীমান্তে উত্তেজনা কমিয়ে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসেবে চীন ও ভারতের সম্পর্ক আঞ্চলিক রাজনীতি, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে।
ব্রিকসের নয়া দিল্লি সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি তাই শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণ—আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে থাকবে।