জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশ কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর সঙ্গে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে আটা, ময়দা, চাল, ডিম ও দুধ। সয়াবিন তেলের সরবরাহেও নতুন করে সংকটের কথা জানিয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। সেই বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করতে গিয়ে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, পরিবহন ব্যয় যতটা বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি হারে কিছু পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাজারে নজরদারি না থাকায় তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন কেউ কেউ।
শুক্রবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ায়। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। বর্তমানে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, অকটেন ১৬৫ ও পেট্রোল ১৬০ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের নতুন কাঁচাবাজারে গুঁড়ো চাল কিনছিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস। ৯০০ গ্রামের এক প্যাকেট গুঁড়ো চালের দাম ৭০ টাকা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, কয়েক দিন আগেও একই প্যাকেট ৬৬ টাকায় কিনেছেন।
দোকানটির স্বত্বাধিকারী সেলিম মিয়া বলেন, আগে আনা পণ্যের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে নতুন করে যে পণ্য কিনতে হচ্ছে, সেগুলোর দাম কেজিতে দুই-তিন টাকা বেশি পড়ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ বাড়তি ব্যয় হচ্ছে বলে তাঁর দাবি। চিড়া ও মুড়ির দামও বাড়তে পারে বলে জানান তিনি।
আটা-ময়দার বাজারেও কয়েক দফা মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। গত মাসে মোড়কজাত ময়দা কেজি ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হলেও এক সপ্তাহ আগে তা বেড়ে ৮০ টাকা হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর আরও ৫ টাকা বেড়ে এখন ৮৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মোড়কজাত আটার দামও কোম্পানিভেদে ৬০-৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা হয়েছে।
খোলা ময়দার দামও সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। আগে ৬৫ টাকা থাকলেও এখন ৬৮ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা আটার দাম ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫০ টাকা। সাম্প্রতিক বাজার পর্যালোচনাতেও আটা-ময়দার দাম বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে।
কারওয়ান বাজারের বিসমিল্লাহ ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপক জহিরুল ইসলাম বলেন, ময়দার দাম কোথায় গিয়ে থামবে তা বলা কঠিন। কোম্পানিগুলো নতুন মূল্য নির্ধারণ করছে এবং সেই দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কথা বলে কোম্পানিগুলো দাম বাড়াচ্ছে বলে জানান তিনি।
চালের বাজারেও কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের আল্লাহর দান চাউল ভাণ্ডারের অংশীদার লোকমান বলেন, কুষ্টিয়া থেকে চাল আনতে গাড়িভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেড়েছে। পাইকারিতে বস্তাপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি পড়ছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন ধান ওঠার মৌসুম হওয়ায় চালের দাম খুব বেশি বাড়বে না বলেও মনে করেন তিনি।
সবজির বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত দৃশ্যমান হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় বেগুন, পটল, ঢেঁড়শ, ঝিঙা, ধুন্দল ও করলার দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে গোল বেগুন ১৬০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল প্রায় ১২০ টাকা। লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা এবং ঝিঙা ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। পটল, করলা ও ধুন্দল ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং ঢেঁড়শ প্রায় ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দামও এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৮০-১০০ টাকা থেকে বেড়ে মানভেদে ১৬০-১৮০ টাকা হয়েছে।
মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারের পাইকারি সবজি বিক্রেতা মো. ইদ্রিস ফকির বলেন, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সবজির ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে। তাঁর হিসাবে, পঞ্চগড় থেকে এক ট্রাক সবজি আনতে আগে যেখানে ২৬ হাজার টাকা ভাড়া লাগত, এখন দিতে হচ্ছে ৩১ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক গাড়িতেই ৫ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে।
তবে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। টাউন হল বাজারের খুচরা বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, পাইকারি ব্যবসায়ীরা যে হিসাব দিচ্ছেন, তা সব ক্ষেত্রে ঠিক নয়। তিনি জানান, বিভিন্ন মানের সবজি একসঙ্গে কিনে বাছাই করতে হয়। ফলে ভালো-মন্দ মিলিয়ে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে হয়।
ডিমের দামও বেড়েছে। দীর্ঘদিন ডজনপ্রতি ১৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া খামারের লাল ডিম এখন ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে অন্য বাজারের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে কিছু এলাকায় ডিমের দাম ১৫০-১৫৫ টাকার মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ বাজারভেদে দামের পার্থক্য রয়েছে।
সয়াবিন তেলের বাজারেও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, বুধবার থেকে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত তেল কিছু দোকানে চাহিদামতো পাওয়া যাচ্ছে না। দুই লিটারের বোতলের সরকার নির্ধারিত দাম ৩৯৮ টাকা হলেও কোথাও কোথাও ৪০৪ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। পাঁচ লিটারের বোতলের নির্ধারিত দাম ৯৭৫ টাকা হলেও কিছু দোকানে ৯৮৮ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মোহাম্মদপুরের বাজারে আসা এক ক্রেতা বলেন, “দেশে এমনিতেই নানা সংকট। তেলের দাম বাড়তেই পারে। কিন্তু তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে সব জিনিসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশে যেটা বাড়ে, সেটা কি কমে?”
তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়েনি। ব্রয়লার মুরগি ও সোনালি মুরগির দাম মোটামুটি আগের পর্যায়েই রয়েছে। সাম্প্রতিক বাজার পর্যবেক্ষণেও ব্রয়লার মুরগি বাজারভেদে প্রায় ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
দুধের বাজারেও নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। মিল্কভিটা গত ৫ আগস্ট থেকে প্রতি লিটার তরল দুধের দাম ১০ টাকা বাড়িয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড তরল দুধের এক লিটারের প্যাকেট ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১০ টাকা এবং ৫০০ মিলিলিটারের প্যাকেট ৫৫ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে।
মিল্কভিটার কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কাঁচা দুধ, জ্বালানি ও উৎপাদন উপকরণের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বাড়তি ব্যয় এবং পরিবহন খরচের কারণে দাম পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি কয়েকটি কোম্পানিও লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত দুধের দাম বাড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহননির্ভর পণ্যের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে। তবে কোন পণ্যের দাম কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করে পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি উৎপাদন, সরবরাহ, মজুত ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাজার তদারকি জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় আরও বাড়লে নিত্যপণ্যের দামে তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক ধাক্কার পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতে এর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাবও বাজারে দেখা দিতে পারে।