- বাণিজ্য ‘যুদ্ধবিরতি’ দুই মাস বাড়লেও ইরান, ইউক্রেন, তাইওয়ান ও এআই নিয়ে বড় সমঝোতার ইঙ্গিত নেই
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরে ছিল রাষ্ট্রীয় জাঁকজমক, সামরিক অভ্যর্থনা, লালগালিচা, সামরিক বিমানের উড্ডয়ন এবং হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ। কিন্তু এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে বড় কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। দুই দেশের বাণিজ্য ‘যুদ্ধবিরতি’ আরও দুই মাস বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতা হলেও শুল্ক, বিরল মৃত্তিকা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, তাইওয়ান, ইরান যুদ্ধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে শিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামরিক ব্যান্ডের পরিবেশনা, গার্ড অব অনার এবং সামরিক বিমানের উড্ডয়নের মধ্য দিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। পরে দুই নেতা ও তাঁদের স্ত্রীদের সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়।
প্রকাশ্য বক্তব্যে দুই নেতাই সম্পর্কের ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। ট্রাম্প শির সঙ্গে সম্পর্ককে ‘সত্যিই চমৎকার বন্ধুত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন। শি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উচিত বড় দেশ হিসেবে দায়িত্বশীলভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করা এবং সংঘাত এড়িয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করা।
তবে উষ্ণ বক্তব্যের আড়ালে দুই দেশের কৌশলগত মতপার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে। শি আবারও ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’-এর প্রসঙ্গ তোলেন। এই ধারণা অনুযায়ী, একটি উদীয়মান শক্তি পুরোনো প্রভাবশালী শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শি বলেন, জাতীয় পরিস্থিতির পার্থক্য সত্ত্বেও গভীর ও ধারাবাহিক সংলাপের মাধ্যমে দুই দেশ পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে পারে।
সফরের সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল এসেছে বাণিজ্য ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে গত বছরের বাণিজ্যযুদ্ধের পর যে ‘যুদ্ধবিরতি’ হয়েছিল, তার মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানো হয়েছে। ফলে বড় ধরনের নতুন শুল্কসংঘাত আপাতত এড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য চুক্তি নয়; বরং বড় সমঝোতার জন্য আলোচনার সময় বাড়িয়েছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনের মার্কিন কৃষিপণ্য কেনা, বিরল মৃত্তিকা সরবরাহ এবং প্রযুক্তি-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ এখনো আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চীন কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে বাণিজ্যযুদ্ধ আপাতত থামলেও মূল বিরোধের সমাধান হয়নি।
তাইওয়ান প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানের মৌলিক পার্থক্যও রয়ে গেছে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রয় নিয়েও বেইজিংয়ের উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো বড় সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।
ইরান যুদ্ধ নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান এক নয়। চীন আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ইরান ইস্যুতে চীনের প্রভাব কাজে লাগাতে আগ্রহী হলেও বেইজিংকে এ বিষয়ে বড় কোনো ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দেখা যায়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন চীনের ওপর ইরানের ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের আশা করলেও বেইজিংয়ের সেই পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা সীমিত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনার পাশাপাশি মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এআইয়ের নিরাপত্তা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দুই দেশের যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দুই দেশের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনায় বসার পরিকল্পনা করেছেন।
অন্যদিকে চীন এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহার দ্রুত বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। শি উন্নত এআই ব্যবস্থাকে মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার কথা বলেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’-এর ওপর জোর দেখা গেছে। ফলে এআই ক্ষেত্রে আলোচনার জায়গা থাকলেও দুই দেশের অগ্রাধিকারে পার্থক্য স্পষ্ট।
শির সফরের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক তাই কূটনৈতিক বার্তার চেয়ে আয়োজনেই বেশি ফুটে উঠেছে। সামরিক অভ্যর্থনা, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং দুই নেতার উষ্ণ বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখার রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে তাৎক্ষণিক সমাধান আসেনি।
রয়টার্সের মূল্যায়নেও বৈঠকটিকে প্রতীকী জাঁকজমকের তুলনায় বাস্তব ফলাফলে সীমিত অগ্রগতির সম্মেলন হিসেবে দেখা হয়েছে। বাণিজ্য ‘যুদ্ধবিরতি’ দুই মাস বাড়ানো দুই দেশের জন্য আপাত স্বস্তি তৈরি করলেও শুল্ক, প্রযুক্তি, তাইওয়ান, ইরান ও এআই নিয়ে মূল প্রশ্নগুলো এখনো আলোচনার টেবিলেই রয়ে গেছে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনে শির সফরে দুই দেশের সম্পর্ক ভেঙে পড়ার বদলে সংলাপের পথ খোলা রাখার বার্তা জোরালো হয়েছে। কিন্তু সেই সংলাপ থেকে বড় কোনো কৌশলগত সমঝোতা এসেছে—এমন দাবি করার মতো ফল এখনো দৃশ্যমান নয়।